প্রকট স্বাস্থ্যবৈষম্য, প্রকট মানুষী অস্তিত্বের সংকট – কোভিড-১৯-এর আরেক চিত্র

0
389

য়ন্ত ভট্টাচার্য: শুরুর কথা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সংবাদপত্রের (১৮.০৫.২০২০) খবর “Migrant worker’s health deteriorates on way home, his friend sticks with him till end”। অমৃত কুমার এবং মোহম্মদ সাইয়ুব একসাথে গুজরাট থেকে উত্তর প্রদেশের বস্তি জেলায় তাদের গ্রামে ফিরছিল। পথে অমৃত কুমার অসুস্থ বোধ করে, জ্বরে বেহুঁশ হয়ে পড়ে। মোহম্মদ সাইয়ুব ওকে ছেড়ে যায়নি। কোন পার্সোনাল/সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং মানেনি। সবাই ছেড়ে চলে গেলেও শেষ অবধি মোহম্মদ সাইয়ুব বন্ধুর সাথে ছিল, হাসপাতালে মৃত্যু পর্যন্ত। করোনা অতিমারি বন্ধুত্বের এক নতুন চিত্রনাট্য রচনা করলো কি? জীবনের ভালোবাসার স্রোতধারা যখন একের পরে এক রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে তখন লেখার নান্দীমুখে হাজির থাকে মোহম্মদ সাইয়ুব এবং অমৃত কুমাররা। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস (১৮.০৫.২০২০) একই দিনে আরেকটি খবর করেছে “’Silent protest is so pwerful’: Belgian medics turn their backs on PM during visit to hospital”। ব্রাসেলসের সেন্ট পিটারস হাসপাতালের চিকিংসক-চিকিৎসাকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট সবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সরকারের তরফে স্বাস্থ্যের জন্য বাজেট বরাদ্দ কমানো, ডাক্তারদের মাইনে কমিয়ে দেওয়া এবং কম মাইনেতে নিম্নমানের নতুন স্টাফ নিয়োগ করার ফলে ৯,০০০-এর ওপরে কোভিড-১৯-এ মৃত্যু ঘটেছে বেলজিয়ামে। তাই পৃষ্ঠ ও পশ্চাদ্দেশ দেখিয়ে নীরব প্রতিবাদ জানাচ্ছেন ডাক্তারেরা। সে ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছে।

ইকোনমিক টাইমস-এর খবর (১৪.০৫.২০২০) জানাচ্ছে – “Fresh support of only Rs 12-13 lakh crore in PM Modi’s economic stimulus: Report”। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এর একটি লেখায় অবশেষে স্বীকার করে নেওয়া হল – “Covid-19 has taken more American lives in 1 month than the Vietnam War claimed over 8 years.” (Failing the Test – The Tragic Data Gap Undermining the U.S. Pandemic Response – 14.05.2020) ঐ লেখায় বলা হয়েছে “With more than 80,000 dead and no end in sight, our national efforts seem feebler and more halting”। কাদের চেয়ে দুর্বলতর (feebler and halting) আমেরিকার বর্তমান জাতীয় প্রচেষ্টা? ভাবুন একবার, ২০২০-তে ক্ষমতাদর্পী আমেরিকায় তুলনায় আনা হয়েছে ১৯শ শতাব্দীর ক্রিমিয়ার যুদ্ধে ফ্লোরেন্স নাইটেঙ্গল এবং উইলিয়াম ফারের প্রচেষ্টা ও উদ্যোগকে। আমার পড়া অন্যতম সেরা যুদ্ধবিরোধী কবিতা রবার্ট সাদির “After Blenheim (The Battle of Blenheim)” মনে পড়ছে এসময়ে। যুদ্ধে নিহত কোন এক সৈনিকের খুলি হাতে ধরে শিশু পিটারকিন প্রশ্ন করেছিল – “But what good came of it at last? / Quoth little Peterkin.” করোনার সঙ্গে যুদ্ধেও আমেরিকা এবং অন্যান্য দেশের মধ্যে ভ্যাক্সিন তৈরি এবং সেটা কার জন্য মূলত ব্যবহৃত হবে – এ নিয়ে লড়াই আজ শুরু হয়েছে সেখানে পিটারকিনের মতো প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে – “বাট হোয়াট গুড কেম অফ ইট?” হয়তো কর্পোরেট শক্তির লাভ হবে। কিন্তু আমজনতার? প্রসঙ্গত স্মরণে রাখবো করোনার অনুষঙ্গে ব্যবহৃত যুদ্ধধর্মী শব্দের ব্যঞ্জনা। আমরা সবার বিরুদ্ধে জিততে চাই – প্রকৃতির বিরুদ্ধেও। তাই এতদিন প্রাণীদেহে মহানন্দে বাস করা ভাইরাসকে এর বাসচ্যুত করে আমাদের শরীরে বসবাসের জন্য ডেকে এনেছি। কিন্তু কি প্রকৃতি, কি মানুষ কারওরই সাথে যুদ্ধের অদম্য স্পৃহায় আমাদের ঘাটতি নেই।

এ যেন এক মৃত্যুমিছিল চলছে – করোনার মৃত্যুমিছিল। কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস ঘটিত যে ভয়ঙ্কর সংক্রমণের সময় আমরা অতিবাহিত করছি সেটা একেবারেই অচেনা, আগন্তুক। মানুষের শরীরের সাথে এর কোন পূর্ব পরিচয় ছিলনা। আগে যে আরএনএ ভাইরাস ঘটিত মহামারি হয়েছে – যেমন, ২০০২-৩-এ সার্স-কোভ-১ বা ২০১২-তে মূলত মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ মার্স (MERS) – সেগুলোর থেকে এর চরিত্র ভিন্ন। এর গায়ে থাকা স্পাইক প্রোটিনের ফলে সংক্রমণক্ষমতা অনেক বেশি। সাধারণ ফ্লু-র চেয়ে ১০ গুণ বেশি সংক্রমণ ক্ষমতা। যদি আমাদের শরীরের ইমিউন সিস্টেম এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি তৈরি করতে পারে তাহলে স্থায়ী সমাধান হবে, যেমনটা হাম, পোলিও বা স্মল পক্সের ক্ষেত্রে হয়েছে – বছরের পরে বছর ধরে আন্তর্জাতিক স্তরে লাগাতার প্রচার এবং প্রতিটি দেশে সার্বজনীন টীকাকরণের ফলে। বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ছাড়া এ রোগগুলো এখন পৃথিবী থেকে নির্মূল হয়ে গেছে। পরের কথা চিকিৎসাবিজ্ঞানের সুখ্যাত ঐতিহাসিক চার্লস রোজেনবার্গ তাঁর ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত প্রবন্ধ “What is an epidemic? AIDS in historical perspective”-এ বলেছিলেন – “Epidemics start at a moment in time, proceed on a stage limited in space and duration, follow a plot line of increasing revelatory tension, move to a crisis of individual and collective character, then drift toward closure.”  এরকম একটি মারণান্তক নাটক আমরা ২০২০-র পৃথিবী জুড়ে দেখছি।

ভারত সহ সমগ্র পৃথিবী জুড়ে করোনার মৃত্যুমিছিল চলছে। আমরা অসহায় চোখে চাক্ষুষ করছি। এটা বন্যা, ঝড় বা আগুন লাগার মতো কোন দুর্বিপাক নয় যে সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো যাবে। বরঞ্চ উল্টোটা – যে যত দূরত্ব রক্ষা করবে তার নিরাপদ থাকার সম্ভাবনা তত বেশি। আক্ষরিক অর্থেই সোশ্যাল/পার্সোনাল ডিস্ট্যান্সিং! নেচার পত্রিকায় (৭ মে, ২০২০) প্রকাশিত “Profile of a killer virus” গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে – যদি একজন প্রতিবেশির কাশি থেকে ১০টি ভাইরাস পার্টিকল বেরোয় তাহলে আমার গলায় ইনফেকশন হবার সম্ভাবনা আছে। আবার যদি প্রতিবেশি আরও কাছে চলে আসে বা কম দূরত্বে থাকে তাহলে তার কাশিতে বেরনো ১০০টি ভাইরাস পার্টিকল সরাসরি গলা থেকে ফুসুফুসে চলে যাবে। কিন্তু কিভাবে গলা বা শ্বাসনালী থেকে কিংবা সরাসরি আক্রান্তের ফুসফুসে এ ভাইরাস পৌঁছয় শুধু সেটুকু নিয়ে ২০০ বছরে প্রাচীন, ঋদ্ধ নেচার পত্রিকা মন্তব্য করছে – it might work its way down to the lungs and debilitate that organ. How it gets down there, whether it moves cell by cell or somehow gets washed down, is not known”। এই হচ্ছে আপাতত করোনাভাইরাস নিয়ে সাম্প্রতিকতম জ্ঞান।

ভিন্ন প্রসঙ্গ worldometer-এর তথ্য অনুযায়ী (১৭.০৬.২০২০ অবধি) পৃথিবীতে মোট আক্রান্ত – ৮,২৮৮,১৮৯; মৃত – ৪৪৬,৬৮২। এর মধ্যে কেবলমাত্র আমেরিকায় মৃত – ১১৯,১৩৭ (ভিয়েতনাম যুদ্ধে সরকারিভাবে মৃতের চেয়ে বেশি), আক্রান্ত ১,৫০৭,৭৯৮। ব্রাজিলে – মৃত ৪৫,৪৫৬, আক্রান্ত – ৪৫,৪৫৬। ইংল্যান্ডে মৃত – ৪১,৯৬৯, আক্রান্ত – ২৯৮,১৩৬। ভারতে মৃত – ১১,৯২২, আক্রান্ত – ৩৫৫,০৬০। এবং অদূর ভবিষ্যতে এ মৃত্যুমিছিল জীবনের অভিমুখে হাঁটতে শুরু করবে এমন কোন লক্ষণ আমাদের দৃষ্টিপথে নেই। আরও কতকগুলো বিষয় আমরা মাথায় রাখবো – (১) মানুষের মাঝে এক এক অদ্ভুত অবদমিত আতঙ্ক (suppressed panic), অনুমিত মৃত্যুভয় (anticipatory dread) এবং অনিশ্চয়তার বাস্তবতা তাড়া করে বেড়াচ্ছে। আমাদের দেশের মোট শ্রমিকের ৪০% অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকের ক্ষেত্রে এ এক দুর্বিষহ অশরীরী বোঝা। করোনা ভাইরাসের আক্রমণ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে ঠেলে দিচ্ছে এক অনিচ্ছাকৃত কাঠামোগত হিংসার মুখে যাকে ইংরেজিতে বলে structural violence. (২) একইসাথে আমরা যেমন করোনাকে “তাড়ানো”-র জন্য এবং আমাদের জাতীয় সংহতির নিদর্শন রাখার জন্য রাষ্ট্রের নির্দেশে কাঁসর-ঘন্টা, ড্রামসেট ইত্যাদি বাজিয়েছি, তেমনি ঠিক রাত ৯টায় ৯-১০ মিনিটের ভারতকে আঁধার করেছি – শুধু জ্বলেছে দিয়া, মোবাইল টর্চ। ঐতিহাসিক হবসবম একে বলতেন “inventing tradition” – নতুন ধরনের জাতীয়তাবাদের পুনরুজ্জীবনের জন্য। (৩) এর বিপরীতে আমাদের সামাজিক বোধে এবং চিন্তায় সহাবস্থান করছে একধরনের “numbing of our collective sensitivity” – আমাদের বিবশ হয়ে যাওয়া সংবেদনশীলতা, যা নিরন্ন, ভুখা, সহায়হীন, স্থানান্তরী, সম্পদ সৃষ্টিকারী অসংগঠিত শ্রমিকদের হীনতম অপমানেও, না-খেয়ে মরে যাওয়াতেও তেমন কিছু অনুভব করেনা। আমাদের বিবশ হয়ে যাওয়া সংবেদনশীলতা আটকে থাকে ভার্চুয়াল দুনিয়ায়।

বর্তমান পৃথিবীর এরকম ভয়াবহ করোনা সংক্রমণ, সমাজতত্ত্বের বিচারে, ভীষণভাবে দৃশ্যমান এবং বোধ্য (visible and discernible)। এর সাথে মাথায় রাখতে হবে মাত্র ৫ মাসের মধ্যে পৃথিবীর ২৩০টি দেশে ছড়িয়েছে এবং একদিকে, পৃথিবী জুড়ে এত সংখ্যক মানুষের মৃত্যু আর, অন্যদিকে, এ ভাইরাসের চরিত্রের বেশিরভাগ অংশই বিজ্ঞানীদের এবং চিকিৎসকদের কাছে অজানা হবার জন্য নিত্যনতুন উপসর্গ নিয়ে ভাইরাস সংক্রমণ। যদিও এ ভাইরাসের যে পরিমাণ সংক্রমণ ক্ষমতা মৃত্যুহার ততটা নয়, কিন্তু পরিস্থিতি সাপেক্ষে মৃত্যুহারও অনেক সময়েই যথেষ্ট বেশি। ৮০-৮১% আক্রান্ত সাধারণভাবে সেরে যায়, ১৪%-এর ক্ষেত্রে উপসর্গ তীব্রতর হয় ও হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়, এবং ৫%-এর ক্ষেত্রে চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে এবং এদের ৪৯% বা তার বেশি ক্ষেত্রে মৃত্যু ঘটে। রোগের “শ্রেণীবিভাজন” – রোগের “শ্রেণীবৈষম্য” স্যার মাইকেল মার্মট তাঁর The Health Gap পুস্তকের শুরু করেছেন এই বাক্যটি দিয়ে – Why treat people and send them back to the conditions that made them sick? পরে এর ব্যাখ্যা করেছেন যে আমরা ডাক্তার হিসেবে আর্ত রোগির চিকিৎসার জন্য প্রশিক্ষিত। কিন্তু যদি মানুষের স্বাস্থ্য এবং behaviour মানুষ যে সামাজিক পরিবেশে থাকে তার সাথে যুক্ত হয় তাহলে, তিনি নিজেকে প্রশ্ন করছেন – “whose job it should be to improve social conditions. Shouldn’t the doctor, or at least this doctor, be involoved?” বড়ো কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিলেন বিশ্ববন্দিত চিকিৎসক তথা এপিডেমিওলজিস্ট স্যার মার্মট। “চোপ! অতিমারি চলছে” বলে আমরা আপাতত প্রশ্নগুলোকে চুপ করিয়ে, ঘুম পাড়িয়ে রাখতে পারি। কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকেই গেলো।

WHO-এর হিসেব অনুযায়ী ২০১৮ সালে ৯০ লক্ষ থেকে ১.১ কোটি মানুষ টিবি রোগে আক্রান্ত হয়েছে। বছরে ১২ লক্ষ অর্থাৎ মাসে ১ লক্ষ মানুষ মারা যায় এই রোগে। এর সাথে যোগ করতে হবে এইচআইভি-আক্রান্ত রোগীদের টিবিতে মারা যাবার সংখ্যা ২,৫১,০০০। ২০১৮-তে ২ কোটি ২৮ লক্ষ মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। এর মধ্যে ৪,০৫,০০০ জন মারা যায়। অথচ আমরা জানি ম্যালেরিয়া নির্মূল প্রোগ্রাম বিপুল উদ্যমে শুরু হয়ে দানবীয় বহুজাতিক কোম্পানির ডিডিটি বিক্রী হয়েছে কয়েক হাজার বা লক্ষ কোটি টাকার। ডিডিটি-র ব্যাপক ব্যবহার প্রকৃতি-জীব জগৎ-মানুষের ভারসাম্য বিনষ্ট করেছে, বসন্ত ঋতুকে স্তব্ধ করে দিয়েছে (র‍্যাচেল কারসনের সাড়া জাগানো পুস্তক Silent Spring দ্রষ্টব্য)। ৫ বছরের কম বয়সের শিশুরা ম্যালেরিয়ায় সবচেয়ে আক্রান্ত হয় এবং ম্যালেরিয়ায় মৃত্যুর ৬৭% শিশু মৃত্যু। এর মধ্যে সাদা মানুষদের বোঝা কালো ও হতদরিদ্র আফ্রিকা অঞ্চলে পৃথিবীর মোট ম্যালেরিয়া সংক্রমণের ৯৩% ঘটে, মৃত্যু ঘটে ৯৪% আক্রান্তের। ৫ বছরের কমবয়সী ৫,২৫,০০০ শিশু প্রতিবছর ডায়ারিয়ার মতো রোগে মারা যায়। প্রায় ২০০ বছর হয়ে গেল শুধুমাত্র পরিশুদ্ধ পানীয় জলের পরিচ্ছন্ন সরবরাহ করে ডায়ারিয়ার মতো অসুখ প্রথম বিশ্ব থেকে বিদায় নিয়েছে। কেবলমাত্র নিরাপদ ও সংক্রমণ-মুক্ত পানীয় জলের ব্যবস্থা এবং স্যানিটেশন ও হাইজিনের ব্যবস্থা করে এ রোগ ঠেকানো সম্ভব। সমগ্র বিশ্বে শিশুদের ডায়ারিয়ায় আক্রান্ত হবার সংখ্যা ১৭০ কোটি।

কিন্তু এ রোগগুলো ক্রনিক এবং দারিদ্র্যের অসুখ। ক্যান্সারের মতো “disease of modernity” নয় (সিদ্ধার্থ মুখার্জির Emperor of All Maladies দ্রষ্টব্য) কিংবা হার্টের বা স্থুলতার মতো হাই-টেক, আকাশছোঁয়া মুনাফা দেবার মতো রোগতো একেবারেই নয়। এজন্য এ অসুখগুলো সাধারণভাবে invisible and indiscernible – দৃশ্যমানতা এবং বোধগম্যতার বাইরে। এদের চিকিৎসার ভাষায় একটা নামই হয়ে গেছে “tropical neglected diseases”। কিন্তু এসব সত্ত্বেও করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ এবং এ রোগগুলোর মধ্যে পার্থক্য আছে। প্রথমত, রোগের ছড়িয়ে পড়ার দ্রুততা, সংক্রমণের ক্ষমতা এবং ব্যাপ্তি। ৫ মাসের মধ্যে ২০০-র বেশি দেশে এরা ছড়ায়নি। দ্বিতীয়ত, উপরের সবকটা রোগেরই চিকিৎসা আছে, করোনার চিকিৎসা নেই। রাষ্ট্রিক অবহেলা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ভেঙ্গেচুড়ে দিয়ে কর্পোরেট পুঁজি নিয়ন্ত্রিত রোগ-কেন্দ্রিক (ভার্টিকাল প্রোগ্রাম) পাঁচতারা হাসপাতাল যেখানে উচ্চমূল্যে হাই-টেক স্বাস্থ্য পরিষেবা (স্বাস্থ্য নয়) বিক্রী করার সমস্ত ব্যবস্থা করার ফলে এ রোগগুলো লক্ষ কোটি মানুষের প্রাণ নিয়ে নেয় প্রতিবছর। তৃতীয়ত, ইংরেজিতে বললে এই ভাইরাসের আক্রমণ বিশ্বজুড়ে যে violence of uncertainty – অনিশ্চয়তা এবং উদ্বেগজনিত যে স্ট্রেস তৈরি করেছে তা একেবারে অভাবিতপূর্ব, অভূতপূর্ব। এ রোগ একইসাথে অবদমিত আতঙ্ক (suppressed panic) এবং প্রবল মৃত্যুভয়ের আশঙ্কা (anticipatory dread) তৈরি করেছে। এই ভাইরাসের সংক্রমণ পৃথিবীর আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক মানচিত্রে সম্ভবত কিছু সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনতে চলেছে।

 

প্রথম, সোভিয়েত শক্তির পতনের পরে একমেরু বিশ্বের অধীশ্বর হবার যে দর্প এবং ঔদ্ধত্য আমেরিকা এতদিন দেখিয়েছে সেখানে বোধহয় একটু চিড় ধরেছে। এমনকি ইয়ুভাল হারারির মতো রাষ্ট্রপন্থী লেখক তথা ইতিহাসকারও তাঁর টাইম পত্রিকায় প্রকাশিত (১৫.০৩.২০২০) প্রবন্ধের শিরোনাম লিখছেন – In the Battle Against Coronavirus, Humanity Lacks Leadership. এর কদিন বাদেই (২০.০৩.২০২০) ফিনান্সিয়াল টাইমস পত্রিকায় আরেকটি বহু আলোচিত প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল – The World After Coronavirus. এখানে তিনি পরিষ্কার ভাষায় জানালেন – In previous global crises – such as the 2008 financial crisis and the 2014 Ebola epidemic – the US assumed the role of global leader. But the current US administration has abdicated the job of leader. সম্প্রতি রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিবও একই কথা বলেছেন – বর্তমান সংকটের সময়ে বিশ্বনেতৃত্বের শূণ্যতা, অভাব। দ্বিতীয়, বিজ্ঞান এবং রাষ্ট্রের মধ্যে এমন নিবিড় ও নির্লজ্জ সখ্য (যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি ছাড়া) যেখানে আন্তর্জাতিক স্তরে বিজ্ঞানীরা বরণ করে নিচ্ছেন রাজনৈতিক নেতাদের এমনটা খুব সুলভ ঘটনা ছিলনা। অতি ধুরন্ধর ব্যবসায়ী এবং রাজনীতির পাকা খেলোয়ার ট্রাম্পের হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন নিয়ে হৈচৈ বাঁধানো “game changer” বলে এবং পত্রপাঠ FDA এবং NIH (National Institute of Health)-এর মতো মান্য, স্বশাসিত সংস্থার পত্রপাঠ একে অনুমোদন দিয়ে ট্রায়াল শুরু করে দেওয়ার চেয়ে ভালো উদাহরণ আর কি আছে? সর্বশেষ খবর হিসেবে এখানে জোর দিয়ে উল্লেখ করা দরকার ১৫.০৬.২০২০-তে হাইড্রোক্সিক্লরোকুন নিয়ে অনেকসংখ্যক বিপজ্জনক ট্রায়ালের পরে বিবৃতি দিয়ে এ ওষুধটির ছাড়পত্র প্রত্যাহার করেছে – FDA Revokes Emergency Use Authorization for Chloroquine and Hydroxychloroquine.

 

স্বাস্থ্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, শ্রেণীবৈষম্য, মেডিক্যাল-ইন্ডাস্ট্রিয়াল-স্টেট-পলিটিক্স কমপ্লেক্স – সবকিছু একসাথে জুড়ে গেল। করোনা ভাইরাসের আক্রমণ চিকিৎসার অভিমুখকে আবার অনিবার্যভাবে ওষুধ, ভ্যাক্সিন এবং হাই-টেক চিকিৎসা (ভেন্টিলেটর, ECMO, মনোক্লোনাল অ্যন্টিবডি, ইন্টারফেরন ইত্যাদি) অর্থাৎ রোগ-কেন্দ্রিক ভার্টিকাল প্রোগ্রামের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সংহত প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পরিবর্তে selective primary care-কে চালকের আসনে বসানোর বাস্তব বৌদ্ধিক ও ব্যবহারিক জমি তৈরি করছে। এই অর্থে করোনা ভাইরাস বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এক জলবিভাজিকা হয়ে উঠবে হয়তো। পৃথিবীর আগামী যাত্রাপথে প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কেবলমাত্র একটি অধরা আশা হয়ে পড়ে থাকবে হয়তো আমাদের সবার কাছে। তৃতীয়, চিন যাতে কোনভাবেই বিশ্বের সামরিক এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্বে ভাগ বসাতে না পারে সেজন্যও করোনা ভাইরাস একটি হাতিয়ার হয়ে উঠছে। এবং, চতুর্থ, এই ভাইরাসের উৎস যে কর্পোরেট পুঁজির মুনাফা এবং প্রকৃতির উপরে প্রভুত্বের উদগ্র লালসা যেখানে মানুষ থেকে জীবজগৎ, বনাঞ্চল থেকে প্রতিটি প্রাকৃতিক সম্ভার কেবলমাত্র পণ্য হিসেবে গণ্য হয় – এ সত্যকে আড়াল করার হাতিয়ারও বর্তমান সময়ের এই ভাইরাস। ২০০২-৩-এ সার্স-কোভ-১-এর অতিমারির পরে ২০০৯ সালে Predict Project বলে একটি প্রোজেক্ট তৈরি করা হয় প্রাণী জগৎ থেকে কি পরিমাণ নতুন ভাইরাস মানুষের দেহে এবং বসবাসের অঞ্চলে প্রবেশ করছে সেটা দেখার জন্য। মানুষ-প্রকৃতি-জীব জগৎ এই স্বাভাবিক ভারসাম্য অপূরণীয়ভাবে ভেঙ্গে যাবার ফলাফল হচ্ছে এই ভাইরাসদের মনুষ্য জগতে প্রবেশ। কিন্তু লস এঞ্জেলস টাইমস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী (২.০৪.২০২০) এই প্রোজেক্ট ট্রাম্প প্রশাসন বন্ধ করে দেয় – Trump administration ended pandemic early-warning programs to detect coronaviruses। য়ুহানে করোনার ভয়াবহতা শুরু হবার মুখে “the Trump administration ended a $200-million pandemic early-warning program aimed at training scientists in China and other countries to detect and respond to such a threat.” বন্ধ করে দেবার আগে USAID-এর সাহায্যপুষ্ট এই প্রোগ্রাম ১,২০০ বিভিন্ন ভাইরাসকে চিহ্নিত করে যার মধ্যে ১৬০টি নোভেল করোনাভাইরাস ছিল। য়ুহান সহ পৃথিবীর ৬০টি ল্যাবরেটরিতে বিজ্ঞানী এবং টেকনিশিয়ানদের ট্রেইনিং দেওয়াও শুরু করেছিল। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন “শিব ঠাকুরের আপন দেশে / আইন কানুন সর্বনেশে”-র মতো কলমের এক আঁচড়ে এরকম একটি মূল্যবান প্রোজেক্ট বন্ধ করে দিল। বিজ্ঞানের ক্ষতি হল, ক্ষতি হল মানুষের।

 

প্রসঙ্গত, দ্বিতীয় বিশযুদ্ধেরও আগের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার মুখে ১৯১৭ সালে এক নতুন ধরনের দেশ তৈরি হল – রাজনৈতিক চরিত্রে, অর্থনৈতিক পরিচালনায়, সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গীতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জগতে, নারীর মানুষ হিসেবে উন্মেষে, এবং, সর্বোপরি, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-জনস্বাস্থ্য-গণবন্টন ব্যবস্থায়। বিশ্বে এই নতুন জায়মান দেশের পরিচিতি ছিল সোভিয়েত সমাজতন্ত্র হিসেবে। কিন্তু আমাদের আলোচনায় শুধু এটুকু বুঝতে চাইবো – Another World is Possible. হ্যাঁ, অন্য এক পৃথিবীর স্বপ্নসম্ভব জীবনের মহাকাব্য রচনা হচ্ছিল মানুষের স্বপ্নে, বুদ্ধিজৈবিক সৃষ্টিতে। এসব ইতিহাস আমরা সবাই জানি – কেউ মানি, কেউ মানিনা। এরপরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধে হিটলারের চূড়ান্ত পরাজয় নিশ্চিত হবার পরে আমেরিকা-ইংল্যান্ড-ফ্রান্স-জাপানের অর্থনৈতিক মডেলের বাইরে, সাংস্কৃতিক চেতনার বাইরে যে আরেকভাবে পৃথিবীকে দেখা যায়, পৃথিবীতে বিচরণ করা সম্ভব সেটা মূর্ত হয়ে উঠলো। অর্থাৎ, বিশ্ব তখন আজকের মতো একমেরু নয়। সেদিন পৃথিবীতে ছিল দ্বিমেরু বিশ্বের শক্তিময় উপস্থিতি। আর এর ফলে বিশ্বের দুর্বল দেশগুলোর দর কষাকষি করার ক্ষমতা বেশি ছিল। স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এর প্রতিফলন দেখা গেল – এক বড়ো সংখ্যক দেশে নীতি হিসেবে গৃহীত হল কমিউনিটি-কেন্দ্রিক বা horizontal programs। এর বিপরীতে ইন্সিউরেন্স কোম্পানি এবং কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে প্রয়োজন রোগ-কেন্দ্রিক বা vertical programs। করোনা অতিমারি আজ একমেরু বিশ্বে দানবীয় ফার্মা কোম্পানি এবং নিওলিবারাল পুঁজির বাহক রাষ্ট্রগুলোর সামনে নতুন করে রোগ-কেন্দ্রিক বা vertical programs-কে একমাত্র স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং প্রোগ্রাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং বাস্তবায়িত করার সুবর্ণ মুহূর্ত তৈরি করেছে। মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্য চুলোয় যাক। চাই আইসিইউ আর ভেন্টিলেটর। পরবর্তীতে এই হাই-টেক চিকিৎসার ধরন আরও বেশি জনগ্রাহ্যতা অর্জন করার সম্ভাবনা রইলো। স্বাস্থ্য-র সংজ্ঞা রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে (আরও বেশি করে যাবে) বহুমুল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবাতে। সাধারণ মানুষের কাছে দুটোই একরম মনে হবে – ম্যাকডোনাল্ড বা কেএফসি-র মতো।

 

দ্বিমেরু বিশ্বে যে ধারণা জনমানসে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিলো একটা সময়ে তা হল আমেরিকা-ইংল্যান্ড-ফ্রান্স-জাপান এতদিন ধরে (প্রায় ২০০ বছর) সার্বজনীন শিক্ষা-স্বাস্থ্য-জনস্বাস্থ্য-কাজের অধিকার-খাদ্যের অধিকার-বাসস্থানের অধিকার নিয়ে যে পথে চলে এসেছে তার বিকল্প আরেকটা রাস্তা আছে। এ রাস্তায় কার্টেলের (কর্পোরেটদের পিতৃপুরুষ) বদলে সমবায়ের ভাবনা আছে। এ রাস্তায় ব্যক্তির লাভালাভ একমাত্র বিষয় না হয়ে সমাজ ও সমষ্টির প্রাধান্য আছে। এ ব্যাপারে উন্নত পুঁজিবাদী তথা সাম্রাজ্যগর্বী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ইংল্যান্ড সবচেয়ে বেশি সমাজবদ্ধতা দেখিয়েছিল। আমেরিকান পরিভাষায় “সমাজতান্ত্রিক” কাঠামো চালু করেছিল। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে এড্যুইন চ্যাডুইক, জন স্নো এবং সাহিত্যিক চার্লস ডিকেন্সের সক্রিয় অংশগ্রহণে ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডে পরিচ্ছন্ন পানীয় জলের সরবরাহ কলেরা প্রতিরোধ এবং সাধারণ জলবাহিত অসুখের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেই ইংল্যান্ডে National Health Service (NHS) তৈরি হল। উল্লেখ করার মতো হল ১৯৪৮-এর জুন মাসে প্রতিটি বাড়িতে একটি লিফলেট বিলি করা হয়েছিল। তাতে লেখা ছিল – It will provide you with all medical, dental and nursing care. Everyone- rich and poor, man, woman or child – can use it or any part of it. There are no charges, except for a few special items. There are no insurance qualifications. But it is not a “charity”. You are all paying for it, mainly as tax payers, will relieve your money worries in time of illness. আরও কিছু প্রসঙ্গ – স্বাস্থ্যের প্রকট অসাম্য আমেরিকায় জাতিবৈরিতা, বিশেষ করে এশিয়ান এবং আফ্রো-আমেরিকানদের ক্ষেত্রে, বেড়ে চলেছে। নেচার পত্রিকায় (৭.০৪.২০২০) সম্পাদকীয় লেখা হচ্ছে – Stop the coronavirus stigma now। বলা হচ্ছে – It’s clear that since the outbreak was first reported, people of Asian descent around the world have been subjected to racist attacks, with untold human costs — for example, on their health and livelihoods … more than 700,000 Many have returned home while their institutions are closed owing to lockdowns, and many might not return.

 

সায়ান্স-এর মতো জার্নালে প্রকাশিত হচ্ছে “An Unequal Blow” শিরোনামে প্রবন্ধ (১৫.০৫.২০২০)। সেখানে মন্তব্য করা হচ্ছে – The coronavirus pandemic reveals the dangers caused centuries of discrimination and neglect। বলা হচ্ছে – Such oppression and its biological effects was not a natural thing. It was something that could have been changed. একইসাথে স্বাস্থ্যের এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার সুযোগ সুবিধের ক্ষেত্রে আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ এবং অন্যান্য দেশের মানুষের মধ্যে প্রকট হচ্ছে বৈষম্য। এরকম সংকটের সময়ে নজরে রাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সাধারণ মানুষের তরফে রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রনেতাদের ওপরে ট্রাস্ট বা বিশ্বাস। এবং এই বিশ্বাসের ভিত্তি হয় সরকারের তরফে স্বচ্ছতাকে নিশ্চিত করা। আমাদের এখানে কর্মহীন, ভিটেছাড়া, স্থানান্তরী (migratory-র বাংলা “পরিযায়ী” শব্দটিতে আমি অস্বস্তি বোধ করি। মানুষ আর পাখীকে এক করে দেখতে চাইছিনা।) অসংগঠিত শ্রমিকদের কয়েক’শ মাইল অবধি খিধে-মোচড়ানো পেটে শিশুকে কাঁধে নিয়ে অন্তহীন হেঁটে চলা। আশ্রয় দেবার জন্য সরকার বা রাষ্ট্র নেই। অত্যন্ত নিদারুণভাবে ট্রেনে কাটা পরে ১৬ জন বা তার বেশি শ্রমিক মারা যাবার পরে এ নিরাপত্তাহীনতা আরো বেশি করে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। দেখিয়ে দিল রাষ্ট্রের তরফে এদের জন্য চরম ঔদাসিন্য এবং এ “অব”-মানুষগুলোর রাষ্ট্রের প্রতি ট্রাস্ট না থাকা। এমনকি সুপ্রিম কোর্টের সদ্য অবসর নেওয়া বিচারপতি বিচারক দীপক গুপ্ত এই মানুষগুলোর ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের ঔদাসিন্যের যে বিষয়টি উত্থাপন করেছেন তা খুব শ্লাঘার বিষয় নয়।

 

কি হয়নি এই স্থানান্তরী অসংগঠিত শ্রমিক এবং এদের পরিবারের ওপরে? কয়েক’শ মাইল রাস্তা হেঁটেছে, কোন খাদ্যের কিংবা যানবাহনের ব্যবস্থা সরকারের তরফে করা হয়নি (অসরকারি বিভিন্ন সংস্থা বিভিন্ন সময়ে তাদের সাধ্যমতো খাদ্যের জোগান দিয়েছে), পুলিশের লাঠিচার্জ হয়েছে, রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে স্রেফ মরে গেছে, স্যানিটাইজার দিয়ে রাষ্ট্রের তরফে “পরিশুদ্ধ” করে নেওয়া হয়েছে, খোলা আকাশের নীচে রোদে পুড়েছে, বৃষ্টিতে ভিজেছে। আর কত মনোরম সংবর্ধনা ভাবা সম্ভব সাধারণ মেধা নিয়ে জন্মানো একজন মানুষের পক্ষে? আমেরিকাতেও ভিন্নভাবে, অন্য চরিত্রের, কিন্তু সমধর্মী সমস্যা আছে। আমেরিকার তথ্য হাতে আছে বলে সহজে কথা বলা যায়। পরপর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকার শিরোনাম উল্লেখ করি। টাইম পত্রিকায় (৭.০৫.২০২০) একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম – “No Income. Major Medical Bills. What Life Is Like for Millions of Americans Facing Financial Ruin Because of the Pandemic”। সায়ান্স ডেইলি-র শিরোনাম – “COVID-19 has unmasked significant health disparities in the U.S.”। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর (২৯.০৪.২০২০) এর একটি প্রতিবেদন – ‘A Terrible Price’: Deadly Racial Disparities of Covid-19। একই সংবাদপত্রের ৭.০৫.২০২০ তারিখের একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম – “For Latinos and Covid-19, Doctors are Seeing an ‘Alarming’ Disparity”। ওয়াশিংটন পোস্টেও সমধর্মী লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। নিউজ উইক-এ (৭.০৪.২০২০) প্রকাশিত প্রবন্ধ – “Coronavirus Disease Discriminates. Our Health Care Doesn’t Have To”। আমাদের এখানে এভাবে স্বাস্থ্য ও সামাজিক অসাম্য নিয়ে এ পরিমাণ লেখা এখনো চোখে পড়েনা। ল্যান্সেট-এ (১৮.০৪.২০২০) প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদনের শিরোনাম – “COVID-19 exacerbating inequalities in the US”। লেখাটিতে মন্তব্য করা হয়েছে – “the pre-existing racial and health inequalities already present in US society are being exacerbated by the pandemic.” অর্থাৎ, আমেরিকার সমাজে আগে থেকেই স্বাস্থ্য এবং জাতের (race) ক্ষত্রে যে বৈষম্য তাকে আরো প্রকট করে তুলেছে। এমনকি এ মন্তব্যও করা হয়েছে যে অতিমারি অতিক্রম করলে – “what is needed afterward is a renewed focus to ensure that health is not a byproduct of privilege.” অর্থাৎ, স্বাস্থ্য রাষ্ট্রের দেওয়া কোন প্রিভিলেজ বা সুযোগ নয়। এর পরের বাক্যটিই সঙ্গতভাবে হবার কথা ছিল – স্বাস্থ্য আমার অধিকার!

 

ঠিক একই কথা প্রযোজ্য মানুষ হিসেবে সম্মান, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান হারানো স্থানান্তরী অসংগঠিত শ্রমিকদের ক্ষেত্রে। এদেরকে আমরা দয়া করছিনা। ট্যাক্সদাতা নাগরিক হিসবে সুষম সংস্থান পাওয়া এদের অধিকার। JAMA (Journal of American Medical Association)-র শিরোনাম (১৫.০৪.২০২০) – “COVID-19 and African Americans”। এখানে বলা হচ্ছে – “Low socioeconomic status alone is a risk factor for total mortality independent of any other risk factors.” নিউ ইংল্যান্ড জার্নালে (৬.০৫.২০২০) প্রকাশিত “Racial Health Disparities and Covid-19 — Caution and Context” প্রবন্ধে এ সমস্যাকে আরও গভীরভাবে সামাজিক প্রেক্ষিত থেকে দেখা হয়েছে। প্রবন্ধের বক্তব্য – “Racial disparities have become central in the national conversation about Covid-19.” বলা হয়েছে কোভিড-১৯-জনিত যে বৈষম্য এখন প্রকট হচ্ছে তাকে বাস্তব জগতে  আর্থ-সামাজিক এবং কাজের সুযোগের বৈষম্যের ফলে তৈরি হওয়া সম্পদহীনতার প্রেক্ষিতে দেখতে হবে। সর্বোপরি, “unemployment, food insecurity and unstable or substandard housing conditions may further perpetuate disparities in health outcomes for people infected by the coronavirus, most specifically among low-income communities of color.” আমদের এখানকার মতোই ওখানেও খাদ্যের অনিশ্চয়তা, বাসস্থানের নিম্নমান এবং মজুরির বৈষম্য বিষময় ফল দিচ্ছে। করোনার অভিঘাতে নগ্ন হয়ে যাচ্ছে আপাত জৌলুষ। সতর্কবাণী শোনা গেছে ল্যান্সেট পত্রিকায় (২.০৪.২০২০) – “As the global economy plunges deeper into an economic crisis and government bailout programmes continue to prioritise industry, scarce resources and funding allocation decisions must aim to reduce inequities rather than exacerbate them.” (Why inequality spread COVID-19) আরও সাম্প্রতিক সময়ে (১৩.০৫.২০২০) নিউ ইংল্যান্ড জার্নালের আরেকটি প্রবন্ধে (“Inequity in Crisis Standards of Care”) পরিষ্কারভাবে বলা হচ্ছে, যে সমস্ত তথ্য উঠে আসছে তাতে কালো আমেরিকানরা বিষম অনুপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কোভিড প্যানডেমিকে। জানানো হচ্ছে – due to the legacy of structural racism and inequality that has resulted in unequal access to affordable health care, safe and stable housing, and quality schools and employment”।

আর আমাদের এখানে? এখনো অবধি স্থানান্তরী শ্রমিকদের অর্থসংস্থান হলনা। এদের হাতে কোন টাকা নেই। ফলে বাজারে কিছু কেনার ক্ষমতাও নেই। পরিণতিতে রাষ্ট্রের দান, সরকারের অনুগ্রহ এবং স্থানীয় নেতাদের বদান্যতার উপরেই এদের নির্ভর করে থাকতে হবে – যদিও নোবেলজয়ী অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় এদের হাতে অন্তত ১০০০ টাকা নগদে দেবার কথা একাধিকবার বলেছেন। এর একটা সম্ভাব্য কারণ গণতন্ত্র কেবল সংখ্যার বিচার করে – ভোটের সংখ্যা। ভোটের বাজারে এদের কদর নেই, কে কোথায় কখন থাকে তার ঠিক ঠিকানা নেই। ফলে রাষ্ট্রের দায় কম। আরেকটা বিষয় হল করোনার এই পরম আতঙ্কের বাজারে আমাদের ভারত রাষ্ট্র ৩টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে – (১) এতদিন ধরে পড়ে থাকা ২০১৯-এর কৃষি সংস্কার আইন পাশ করিয়ে নিয়েছে, (২) কৃষকরা কেউ হাতে নগদ টাকা পাবেনা, কিন্তু ব্যাংক থেকে লোন নিতে পারবে (ফলে আরও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জালে বাঁধা পড়বে), এবং (৩) সামরিক ক্ষেত্রে কোন্রকম অনুমোদন ছাড়াই FDI (Foreign Direct Investment বা সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ৪৯% থেকে ৭৪% হয়ে গেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা-কে (১৩.০৫.২০২০) দেওয়া নিতি আয়োগের (NIITI Ayog) ভাইস চেয়ারম্যান রাজীব কুমার এক ইন্টারভিউয়ে বলেছেন – “You will see a spate a reforms now, as you have seen in case of labour reforms in the states. (The PM) is bent upon turning this crisis into an opportunity, and I think this is what will happen.”

৫ মাস ধরে বিদ্যমান এই সংকটের সময়েও ফোর্বস-এর পত্রিকায় (২৫.0৪.২০২০) সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছে – Billionaire Bounceback: 10 Tycoons Gained $126 Billion Over The Past Month। এই কুবেরদের মধ্যে অ্যামজনের জেফ বেজোস থেকে আমাদের মুকেশ আম্বানি এরকম ১০ জন আছেন। “জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি”-র মতো ব্যাপার আর কি! বুঝ জন যে জানো সন্ধান!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here