“গুলাবো সিতাবো” : দৈনন্দিন পুতুলনাচের সাদামাটা জীবনে রূপকথার ম্যাজিক সৃষ্টি করতে পারেন জাদুকর সুজিত

0
208

অভিনয় : অমিতাভ বচ্চন,  আয়ুষ্মান খুরানা, বিজয় রাজ, বিজেন্দ্র কালা, ফারুক জাফর, সৃষ্টি শ্রীবাস্তব 

পরিচালনা : সুজিত সরকার

রেটিং : ৪/৫

দেবলীনা ব্যানার্জী : নাটক থেকে যদি নাটকীয়তাকেই বাদ দেওয়া হয়, তাহলে পড়ে থাকে কি? চালতা থেকে চাল বাদ কিম্বা আমড়া থেকে আম বাদের মত প্রশ্ন করলাম মনে হচ্ছে। উত্তর যার যার নিজস্ব মতের উপর নির্ভর করে পৃথক হতে বাধ্য, কিন্তু আমার মতে নাটক থেকে নাটকীয়তাকে নির্বাসন দিলে পড়ে থাকে দর্পন। যে দর্পনে নিজের প্রতিকৃতি দেখে চোখ বড় করে তাকিয়ে থাকতে হয়। নিজের সাথে আড়ালের কোনো অবশেষ থাকে না। সুজিত সরকারের ‘গুলাবো সিতাবো’ দেখে তাঁরই আগের একটি ছবি ‘অক্টোবর’ কে ভীষণ মনে পড়ে গেল।

একজন বানিজ্যসফল পরিচালক কোন সাহসে এমন রূপকথা বানিয়েছিলেন তা বিস্ময় জাগিয়েছিল সেসময়। মনে হয়েছিল এ শুধু একবারই, আর সে সাহস হয়ত দেখাবেন না সুজিত। ‘গুলাবো সিতাবো’ এনে সেই চিন্তা যে কত বড় ভুল তা প্রমান করলেন পরিচালক। এবার বারবার তাঁর কাছে রূপকথার অপেক্ষা থাকবে। বড়পর্দায় ছবির কিছু দৃশ্য বেশি ভালো লাগত নিঃসন্দেহে,  কিন্তু পরিস্থিতি বিচার করে ডিজিটাল মাধ্যমে দেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ নির্মাতাদের।

অ্যামাজন প্রাইমে দেখানো শুরু হয়েছে  ‘গুলাবো সিতাবো’। এইপ্রথম কোনো বড়পর্দার জন্য বানানো ছবি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেল। সেদিক থেকে ইতিহাস তৈরি করে পথপ্রদর্শকের জায়গা দখল করেছে এ ছবি। এবার গল্পে আসা যাক। ছবির মুখ্য চরিত্র ফাতিমা। না না ফাতিমা কোনো মহিলা নয়, এক জরাজীর্ণ অট্টালিকা (হাভেলি)। আর এই অট্টালিকাকে কেন্দ্র করে পরজীবীর মত বেঁচে থাকা কিছু চরিত্র ছবির কুশীলব। সাধারণ ছাপোষা এইসব  মানুষেরা দোষ, ত্রুটি এবং দুর্বলতায় পূর্ণ।  মির্জা (অমিতাভ বচ্চন) যেমন হাঁড়-কিপ্টে, তেমনই লোভী।

স্ত্রীর মৃত্যুতে বিরাট অট্টালিকার মালিক হবে সে। তাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে মির্জা, কবে জীবনাবসান হবে ফাতিমার। অন্যদিকে আমরা পাই বাঁকে-কে। সাধারণ নিম্নবিত্ত ছেলে। মা ও তিন বোনের দায়িত্ব তার ঘাড়ে। সে জানেই না তার বোনেরা কে কোন ক্লাসে পড়ে। ছোটবোনকে চাকরিও করতে দিতে চায় না সে, পৌরুষে আঘাত লাগে বলে। এরকমই নানা চরিত্রের বাস লখনৌয়ের ফাতিমা মহলে। ‘গুলাবো সিতাবো’ আসলে  পুতুলখেলা মাত্র, যেখানে দুই যুযুধান চরিত্র একে অপরকে পর্যুদস্ত করতে চায়। গুলাবো এবং সিতাবো, দুটি পুতুল দিয়েই শুরু হয়  ছবিটি।

কিন্তু যত ছবিটি এগোতে থাকে, ক্রমশ আমরা বুঝতে পারি, আমরা প্রত্যেকেই সেই পুতুল। আর যখন বুঝতে পারি, সাদামাটা জীবনের মানবিক ছবির ভাষ্য ক্রমশ পালটে হয়ে যায় রুপকধর্মী।গোটা ছবি জুড়েই আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক রূপক চলতে থাকে। যেখানে ফাতিমামহল সাধারণ মানুষের ছুঁতে চাওয়া স্বপ্ন হয়ে ওঠে। স্বপ্নের সন্ধানে ছুটে বেড়ানো  একাকী বিধ্বস্ত মির্জাদের জীবন, বাঁকের জীবন চলছে ও শেষ হয়ে যাচ্ছে। হয়তো একটি স্বপ্ন দেখতে দেখতে, একদিন তারাও ওই হাভেলির মালিক হয়ে উঠবে, নিয়ন্ত্রক হবে। পালটে যাবে বেঁচে থাকার সংজ্ঞা। কিন্তু সব স্বপ্ন তো সত্যি হয় না।

এখানে রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা সুপরিকল্পিত রূপকের আড়ালে প্রবেশ করে গল্পে।সাধারণ মানুষ যত স্বপ্নই দেখুক, স্বপ্ন অধরা থেকেই যায়। ভোটবাক্সে গণতন্ত্রের রায় দেওয়া মানুষ গদির উত্তরাধিকার পায় না। রাজনীতি,  সমাজ ও পুঁজিবাদ নিজেদের মত করে ব্যবহার করে তাদের, স্বপ্ন দেখিয়ে পরিশেষে ব্রাত্য করে দেয় । বাকিটা ছবি দেখলেই বুঝতে পারবেন। বর্তমান সময়ের ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধের নানা দিক ‘গুলাবো সিতাবো’ ছবির কমিক এবং স‌্যাটায়ারিকাল মেজাজের মাধ‌্যমে দারুণভাবে তুলে ধরেছেন পরিচালক। কিপটে বদমেজাজি বাড়িমালিক কিংবা মিথ্যুক ভাড়াটের নানা ফন্দি দেখতে দেখতে মজা পেলেও, তার ভিতরে যেন লুকিয়ে আছে এক করুণ কাহিনি।

ছবির শেষে বদমেজাজি মির্জা এবং ঝগড়ুটে বাঁকের জন‌্য খারাপ লাগে। গল্পকার এবং চিত্রনাট‌্যকার জুহি চতুর্বেদী এই দুটো চরিত্রের নানা স্তর যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তা প্রশংসাযোগ‌্য। আপাতভাবে মির্জা এবং বাঁকেকে এক বদমাইশ বুড়ো এবং তার কুচক্রী ভাড়াটে মনে হলেও দিনের শেষে ওদের খুব সাধারণ মানুষ বলেই মনে হবে। তাদের কৃতকর্ম হাসির উদ্রেক করলেও তার পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর হতাশা। হাসি, হতাশা ও সামাজিক অবক্ষয়ের মিশেল এই ছবি যেন আমাদের সামনে তুলে ধরে আয়না। ৭৮ বছর বয়সী মির্জা  তার চেয়ে ১৭ বছর বয়সের বড় বেগমকে বিয়ে করে ফাতিমা মহলের জন্য, আবার বেগমও তার প্রেমিক আবদুর রহমানকে ছেড়ে মির্জাকে বিয়ে করে কারণ সে ছিল এই বাড়ির প্রতি বিশ্বস্ত।

মির্জা অপেক্ষা করে, কবে বেগম মরবে এবং সে হবে মালিক। বুড়ো শরীরে, শরীরকে টানতে টানতে নিজের লোভ এবং বহুদিনের চেপে বসিয়ে রাখা মালিকসত্ত্বার মধ্যে বিরোধ হয় কখনও কখনও। বারবার আইনের সাহায্য নেয় এই সব ভাড়াটেদের হাত থেকে বাঁচার জন্য। কিন্তু কিছুই হয় না। ওদিকে আছে পুরাতত্ত্ব বিভাগের জ্ঞানেন্দ্র শুক্লা (বিজয় রাজ), যে শকুনের মতো খুঁজে বেড়ায় এমন কোনও বাড়িকে, যাকে প্রথমে হেরিটেজ বিল্ডিং আর তার পরে এলাকার রাজনীতিবিদদের নানান ব্যবসায়িক সুবিধার অঙ্গীভূত করে দেবে। এলাকার রাজনীতিবিদ, পুলিশ সকলের সঙ্গে তার লেনদেনের সম্পর্ক।অর্থাৎ ক্ষমতা এবং অধিকারের খেলা চলছে চারিদিকে।ক্রমে, আইনের খেলায় যখন পুরাতত্ত্ব বিভাগ এবং মির্জা প্রত্যেকেই দাবি করছে এই হাভেলি তাদের, শোনা যায়, বেগম, যে কিনা প্রকৃত মালকিন, সে চলে গেছে এই বাড়ি ছেড়ে।

৯৫ বছর বয়সে সে হাত ধরেছে আবার তার পুরনো প্রেমিক আবদুর রহমানের, মাত্র ১ টাকায় এই হাভেলি তাকে বিক্রি করে।ছবির  শেষে একটি ঘর পায় মির্জা। একটি প্রাচীন কেদারা পায়, কিন্তু তা মাত্র ২৫০ টাকা দামে সে বিক্রি করে দেয়, যার দাম পরে ওঠে দেড় লক্ষ টাকা। বেগমের জন্মদিন পালিত হয় সুসজ্জিত সংরক্ষিত হাভেলিতে। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে বাঁকে ও মির্জা। অধিকারের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। মালিক আর হয়ে ওঠা হয় না মির্জার বা ভাড়াটেদের। দেশটা পালটে যায়, বাড়িও পালটে যায়।

কী সূক্ষ্মভাবে ছোটগল্পের আঙ্গিকে  সুজিত এখানে তুলে এনেছেন জীবনযন্ত্রণাগুলিকে, স্বপ্নগুলিকে। আর তুখোড় অভিনয়ে, ভাষাময় নৈঃশব্দ্যে, ভারসাম্যে অমিতাভ বচ্চন তুলে এনেছেন মির্জার চরিত্র! অকল্পনীয়। ছবির শেষে এই বাড়ি যেন আসলে ভারতবর্ষের রুপক হয়ে ওঠে। ছবির মুখ্য দুই ভূমিকায় অমিতাভ বচ্চন ও আয়ুষ্মান খুরানার অনবদ্য অভিনয় দু’ঘন্টা ধরে আপনাকে আকৃষ্ট করে রাখবে। বলিউডে স্টারের ধারণা যে বদলে যাচ্ছে, তাতে শেষ পেরেকটা মেরে দিল এ ছবি। এককালের সুপারস্টার অমিতাভ বচ্চন যেভাবে নিজেকে ভেঙেছেন ভাবলেই অবাক হতে হয়। তুলনায় অনবদ্য অভিনয় করলেও আয়ুষ্মান যেন কিছুটা ম্লান। সেজন্য দায়ী অবশ্য পরিচালক ও ছবির চিত্রনাট্য।

অমিতাভকে সুজিত সরকার এ ছবিতে যেন নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন। একসময়ের ‘অ‌্যাংরি ইয়ংম‌্যান’  এই ধরনের ভাঙাচোরা, হেরে যাওয়া চরিত্রে যেন অন্য মানুষ।  আসলে ‘গুলাবো সিতাবো ‘ র মির্জা আর বাঁকে তো হিরো নয়, বরং হেরে যাওয়া মানুষ। তাই এ চরিত্রে স্টার অপ্রয়োজনীয় জেনে দুই সুপারস্টার নিজেদের একদম মাটির কাছাকাছি নিয়ে এসেছেন, সাধারনের ভিড়ে নিজেদের মিশিয়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি অন্যান্য ছোটবড় চরিত্র সকলেই অসাধারণ। বিজয়রাজ, বিজেন্দ্রকালা দক্ষ অভিনেতা, নতুন করে কিছু বলার নেই। বেগমের চরিত্রে ফারুক জাফর অতুলনীয়। তবে সবচেয়ে বেশি চমকে দিয়েছে আয়ুষ্মানের বোনের চরিত্রে সৃষ্টি শ্রীবাস্তবের অভিনয়। ছবির মেজাজের সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছে শান্তনু মৈত্রর আবহসংগীত। শেষে শুধু একটা কথাই বলব ‘গুলাবো সিতাবো’কে দয়া করে কেউ কমিক ছবি ভেবে নিয়ে দেখতে বসবেন না। বং জুন হোর প্যারাসাইটকে কেউ যদি হাসির ছবি ভাবেন, তাহলে যিনি ভাববেন, তিনিই হাসির যোগ্য।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here