কুটিল্ আবর্তে করোনা – বিশ্ব রাজনীতি এবং কর্পোরেট পুঁজির ঊর্ণজাল

0
294
File picture

ডঃ জয়ন্ত ভট্টাচার্যঃ বনমালী নস্কর লেনের ঘনাদা করোনা শুনে হয়তো ভালো বুঝতেন না। কিন্তু শিবু যদি একটু ধরিয়ে দিত – “ইয়ে, মানে, ঘনাদা, এটাকে এখন বলে সার্স-কোভ-২। আগে করোনা বলে জানতো সবাই।” ঘনাদা হা হা করে হেসে উঠতেন হয়তো। তারপর খানিকটা আত্মমগ্ন হয়ে নিজের মনে বিড়বিড় করে বলতেন – “হ্যাঁ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ***** দ্বীপে সে এক ঘটনা ঘটেছিল। তাইতেই না এ ভাইরাসটা জব্দ হল।” আমাদের এবার ঘনাদাকে ছেড়ে যেতে হবে। দ্বিতীয় বিশযুদ্ধেরও আগের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার মুখে ১৯১৭ সালে এক নতুন ধরনের দেশ তৈরি হল – রাজনৈতিক চরিত্রে, অর্থনৈতিক পরিচালনায়, সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গীতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জগতে, নারীর মানুষ হিসেবে উন্মেষে, এবং, সর্বোপরি, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-জনস্বাস্থ্য-গণবন্টন ব্যবস্থায়। বিশ্বে এই নতুন জায়মান দেশের পরিচিতি ছিল সোভিয়েত সমাজতন্ত্র হিসেবে। কিন্তু আমাদের আলোচনায় শুধু এটুকু বুঝতে চাইবো – Another World is Possible. হ্যাঁ, অন্য এক পৃথিবীর স্বপ্নসম্ভব জীবনের মহাকাব্য রচনা হচ্ছিল মানুষের স্বপ্নে, বুদ্ধিজৈবিক সৃষ্টিতে। এসব ইতিহাস আমরা সবাই জানি – কেউ মানি, কেউ মানিনা। এরপরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধে হিটলারের চূড়ান্ত পরাজয় নিশ্চিত হবার পরে আমেরিকা-ইংল্যান্ড-ফ্রান্স-জাপানের অর্থনৈতিক মডেলের বাইরে, সাংস্কৃতিক চেতনার বাইরে যে আরেকভাবে পৃথিবীকে দেখা যায়, পৃথিবীতে বিচরণ করা সম্ভব সেটা মূর্ত হয়ে উঠলো। ১৯৪৯-এ আরেকটি বিশাল দেশ চিন একই ধরনের রাজনৈতিক পরিচালনা, একই ধরনের মতাদর্শগত বিশ্বাস নিয়ে মুক্ত হল। আরেকবার এক গভীর প্রত্যয় সমাজের উচ্চকোটি বুদ্ধিজীবী সমাজ থেকে মধ্যবিত্ত, গ্রামের চাষাভুসো মানুষ থেকে কারখানার মজুর সবার মাঝে উপ্ত হল, সামাজিক বাস্তব হল – Another World is Possible. অর্থাৎ, বিশ্ব তখন আজকের মতো একমেরু নয়। সেদিন পৃথিবীতে ছিল দ্বিমেরু বিশ্বের শক্তিময় উপস্থিতি। আর এর ফলে বিশ্বের দুর্বল দেশগুলোর দর কষাকষি করার ক্ষমতা বেশি ছিল।

স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এর প্রতিফলন দেখা গেল – এক বড়ো সংখ্যক দেশে নীতি হিসেবে গৃহীত হল কমিউনিটি-কেন্দ্রিক বা horizontal programs। এর বিপরীতে ইন্সিউরেন্স কোম্পানি এবং কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে প্রয়োজন রোগ-কেন্দ্রিক বা vertical programs। করোনা অতিমারি আজ একমেরু বিশ্বে দানবীয় ফার্মা কোম্পানি এবং নিওলিবারাল পুঁজির বাহক রাষ্ট্রগুলোর সামনে নতুন করে রোগ-কেন্দ্রিক বা vertical programs-কে একমাত্র স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং প্রোগ্রাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং বাস্তবায়িত করার সুবর্ণ মুহূর্ত তৈরি করেছে। মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্য চুলোয় যাক। চাই আইসিইউ আর ভেন্টিলেটর। পরবর্তীতে এই হাই-টেক চিকিৎসার ধরন আরও বেশি জনগ্রাহ্যতা অর্জন করার সম্ভাবনা রইলো। স্বাস্থ্য-র সংজ্ঞা রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে (আরও বেশি করে যাবে) বহুমুল্যে কেনা স্বাস্থ্য পরিষেবাতে। সাধারণ মানুষের কাছে দুটোই একরম মনে হবে – ম্যাকডোনাল্ড বা কেএফসি-র মতো।

এখানে যেটা প্রধান হয়ে এলো সেটা হল আমেরিকা-ইংল্যান্ড-ফ্রান্স-জাপান এতদিন ধরে (প্রায় ২০০ বছর)  সার্বজনীন শিক্ষা-স্বাস্থ্য-জনস্বাস্থ্য-কাজের অধিকার-খাদ্যের অধিকার-বাসস্থানের অধিকার নিয়ে যে পথে চলে এসেছে তার বিকল্প আরেকটা রাস্তা আছে। এ রাস্তায় কার্টেলের (কর্পোরেটদের পিতৃপুরুষ) বদলে সমবায়ের ভাবনা আছে। এ রাস্তায় ব্যক্তির লাভালাভ একমাত্র বিষয় না হয়ে সমাজ ও সমষ্টির প্রাধান্য আছে। রবীন্দ্রনাথের বলা (যদিও একুশ শতকের পৃথিবীতে তার কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক এবং মতদ্বৈধ প্রত্যাশিত) গ্রামসভার কথা, গ্রামের সমূহকে ব্যবহার করে গ্রামে পুকুর খোঁড়া, গ্রামকে পরিচ্ছন্ন রাখা, গ্রামের সিদ্ধান্ত প্রাথমিকভাবে গ্রামে নেওয়া (প্রসঙ্গত সমধর্মী ধারণা গান্ধীজিরও ছিলো) এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো মানুষের বোধে জারিত হতে শুরু করেছিলো। অন্য একটা প্রসঙ্গও যারা ভাবনাচিন্তা করে তাদের চিন্তায় এল – জনস্বাস্থ্যের (পাবলিক হেলথ) এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের (ক্লিনিক্যাল হেলথ) মধ্যেকার সম্পর্ক কি হবে? কিভাবেই বা এ’দুয়ের মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও টানাপোড়েন মেটানো হবে? স্থানীয় উদ্যোগকে কিভাবে সংগঠিত করা হবে? রাষ্ট্রের পরিকল্পনার সাথে একে সম্পর্কযুক্ত করা হবে কি পদ্ধতিতে? আমরা চিকিৎসক-চিকিৎসাকর্মী এবং চিকিৎসাপ্রার্থী সাধারণ মানুষ যদি রাষ্ট্রের শেখানো, কর্পোরেটদের বোঝানো আর পুঁজি-অনুগামী মিডিয়া উৎপাদিত তথ্যকেই (জ্ঞানও কি?) একমাত্র ও অভ্রান্ত বলে ধরে না নিই তাহলে আমাদের বড়ো প্রিয়, আমাদের একান্ত আশ্রয় এই পৃথিবীতে অন্য কি কি সম্ভাবনা খুলেছিল সেগুলো আমাদের আরেকবার বুঝে নেওয়া দরকার – Overton window-র বাইরে এসে।

এ ব্যাপারে উন্নত পুঁজিবাদী তথা সাম্রাজ্যগর্বী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ইংল্যান্ড সবচেয়ে বেশি সমাজবদ্ধতা দেখিয়েছিল। আমেরিকান পরিভাষায় “সমাজতান্ত্রিক” কাঠামো চালু করেছিল। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে এড্যুইন চ্যাডুইক, জন স্নো এবং সাহিত্যিক চার্লস ডিকেন্সের সক্রিয় অংশগ্রহণে ভিকটোরীয় ইংল্যান্ডের পানীয় জলের সরবরাহের সংস্কার কলেরা প্রতিরোধ এবং সাধারণ জলবাহিত অসুখের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। এরপরের ইতিহাস এখন আমাদের বর্তমান আলোচনার জন্য খুব প্রয়োজনীয় নয়। শুধু এটুকু উল্লেখ করি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেই ইংল্যান্ডে National Health Service (NHS) তৈরি হল। উল্লেখ করার মতো হল ১৯৪৮-এর জুন মাসে প্রতিটি বাড়িতে একটি লিফলেট বিলি করা হয়েছিল। তাতে লেখা ছিল – It will provide you with all medical, dental and nursing care. Everyone- rich and poor, man, woman or child – can use it or any part of it. There are no charges, except for a few special items. There are no insurance qualifications. But it is not a “charity”. You are all paying for it, mainly as tax payers, will relieve your money worries in time of illness.

সেই সময়ে দুটি দেশে দুরকমের ঘটনা ঘটছিল। সদ্য স্বাধীন ভারতবর্ষে Bhore কমিটির রিপোর্ট (অনেকটা ব্রিটেনের আদলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরে জোর দিয়ে) বাস্তবায়নের একটা আঁধখ্যাচড়া চেষ্টা চলছিল। আর সেসময়েই আমেরিকাতে শুরু হয়ে গেছে ইন্সিউরেন্সের যুগ, শুরু হয়েছে কর্পোরেট হাসপাতালের নতুন অধ্যায়। নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে সমগ্র বিশ্বকে ইন্সিউরেন্স এবং কর্পোরেট পুঁজির জালে বেঁধে ফেলার। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো যে মেডিক্যাল পরিষেবাকে মুক্ত বাজারের হাতে ছেড়ে দেবার এবং একটি প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্র হিসেবে দেখার প্রথম প্রস্তাব আসে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ কেনেথ অ্যারো-র সুবিখ্যাত গবেষণাপত্র “Uncertainty and the Welfare Economics of Medical Care”। এ লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল The American Economic Review-এ ১৯৬৩ সালে। মজার ব্যাপার হল জনস্বাস্থ্য নিয়ে WHO-র অবস্থান সাম্রাজ্যবাদ এবং কর্পোরেট পুঁজির চাপে যখন ক্রমাগত বদলে বদলে যাচ্ছে, সংকুচিত হচ্ছে জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্র এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যের প্রসঙ্গ তখন অর্থাৎ ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে WHO-র মুখপত্র Bulletin of the WHO-তে কেনেথ অ্যারো-র লেখাটির নির্বাচিত অংশ ছাপা হল। মূল লেখাটি ৩৩ পৃষ্ঠার, WHO ছেপেছিল ৯ পৃষ্ঠা। অ্যারো তাঁর অবস্থান প্রবন্ধের গোড়াতেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন – “the subject is the medical-care, not health. The causal factors in health are many, and the provisio of medical care is only one.” এরপরে তিনি “analysis of the medical-care market”-এ প্রবেশ করেন। বলেন – “in the analysis of the medical-care market is comparison between the actual market and the competitive model…” ইন্সিউরেন্সের প্রসঙ্গ আনেন অ্যারো – “It is frequently observed that widespread medical insurance increase the demand for medical care.” এক অদ্ভুত যুক্তি জালের মধ্যে আমরা প্রবেশ করলাম – একদিকে, ইন্সিউরেন্সের প্রসঙ্গ এলো স্বাস্থ্য পরিষেবার জগতে; অন্যদিকে, ইন্সিউরেন্সের বহু বিস্তৃত ব্যবহার যে স্বাস্থ্য পরিষেবার চাহিদা বাড়াবে এ প্রসঙ্গও চলে এলো। কিন্তু তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি যে পণ্য দুনিয়ার অন্যক্ষেত্রের মতো এখানে শুধু কেনাবেচার-র সম্পর্ক নয় – একজন ব্যক্তি মানুষের অন্যের স্বাস্থ্য নিয়েও চিন্তা ও ঊদ্বেগ থাকে যা পণ্য জগতের অন্যক্ষেত্রে দেখা যাবেনা। তাঁর অভিমত – “The economic manifestations of this taste are to be found in individual donations to hospitals and to medical education, as well as in the widely accepted responsibilities of government in this area.” KFC, Nike কিংবা অ্যাডিডাসের ক্ষেত্রে আমরা নিশ্চয়ই এ দৃশ্য দেখতে পাবোনা।

প্রসঙ্গত আমরা স্মরণ করবো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে পারমাণবিক বিস্ফোরণের প্রয়োজনে নতুন নতুন প্রযুক্তির জন্ম হয়েছিলো (যেমন নিউক্লিয়ার অ্যাক্সিলেরটর, যার ফলিত চেহারা সিটি স্ক্যানার, এম আর আই ইত্যাদি) এবং এর জন্য স্বাভাবিকভাবেই বিপুল অর্থের বিনিয়োগ হয়েছিলো। যুদ্ধোত্তর সময়ে এই বিনিয়োগের পরবর্তী দীর্ঘকালীন মুনাফা ধরে রাখার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে এ সমস্ত প্রযুক্তি রফতানি নিতান্ত জরুরী হয়ে পড়লো। মেডিসিনের জগত এক্ষেত্রে সবচেয়ে সফল ও কার্যকরী অবস্থা তৈরি করতে পেরেছিল। কারণ সহজেই অনুমেয়। পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব মুহূর্ত থেকে সবসময়েই মানুষের স্বাস্থ্য ও অসুস্থতা একসাথে সহাবস্থান করে। ফলে অসুস্থ মানুষ মেডিসিনের ও চিকিৎসকের ওপরে নির্ভর করবেই এবং এর সাথে সমগ্র চিকিৎসা ব্যবস্থাকে যদি প্রযুক্তি নির্ভর করে তোলা যায় তাহলে অসুস্থতা থেকে আহরণ করা অবাধ মুনাফা নিয়ে দুশ্চিন্তা কমে যায়। এর পূর্বশর্ত দুটি – (১) চিকিৎসাকে মুক্ত বাজারের অর্থনীতির আওতায় আনতে হবে এবং সাধারণ জনসমাজকে এই অর্থনৈতিক দর্শনে বিশ্বাসী করে তুলতে হবে, (২) স্বাস্থ্য-র এবং “সংহত প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা”-র (comprehensive primary health care) ধারণাকে স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং “বেছে নেওয়া প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা”-র (selective primary health care) ধারণা দিয়ে ধীরে ধীরে প্রতিস্থাপিত করতে হবে। একই সাথে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বাস্থ্য পরিষেবাকে পূর্ণত মুক্ত করে ফেলতে হবে। গবেষকেরা দেখিয়েছেন কিভাবে ১৯৭০ পরবর্তী সময়ে নয়া-উদারবাদী স্বাস্থ্যনীতি “have shifted resources from the public to the private sector, reduced benefits to recipients, and affected the lives of clients and workers alike.” (Mimi Abramovitz, Jennifer Zelnick, “Double Jeopardy: The Impact of Neoliberalism on Care Workers in the United States and South Africa”, International Journal of Health Services 2010, 40 (1): 97-117)

আমরা গত শতাব্দির ৬০-৭০-এর দশকের কথা ভাবি। দীর্ঘকালীন উপনিবেশিকতার পরে এশিয়া, আফ্রিকা আর লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর একটা বড় অংশ ধীরে ধীরে স্বাধীনতা অর্জন করছে। দুটি বিষয় এসব দেশের কাছে গুরুত্ব নিয়ে হাজির হল। একদিকে, নিজস্ব যা যৎসামান্য সম্পদ আছে (বিশেষ করে মানব সম্পদ) তার সর্বোচ্চব্যবহার করতে হবে; অন্যদিকে, যুদ্ধ-দারিদ্র্য-বুভুক্ষা-দীর্ণ অগণন মানুষের কাছে স্বাস্থ্যের ন্যূনতম সুযোগ পৌঁছে দিতে হবে। ১৯৬৭ সালে একটি গবেষণা দেখালো – Some developing countries have developed health care programmes at the most peripheral level to meet the health and development needs of the deprived populations. Each experience has followed a particular approach. China uses mass education programmes and “barefoot doctors” to deliver primary health services. (Amor Benyoussef, Barbara Christian, “Health care in developing countries”, Social Science and Medicine 1967, 11 (6-7): 399-408) এদের আলোচনায় স্পষ্টভাবে বলা হল চীনে নগ্নপদ চিকিৎসক বা “barefoot doctors” এ সমস্যার অনেকটা সমাধান করেছে। এছাড়াও তানজানিয়া, কিউবা, ভেনেজুয়েলা এবং নাইজেরিয়াতে প্রায় একইরকম পদ্ধতিতে ফল পাওয়া যাচ্ছে। পৃথিবীতে সূচনা হল প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধারণার। ১৯৬০-এর দশকের শুরু থেকেই মেক্সিকোতে ডেভিড ওয়ার্নার-এর (সুবিদিত গ্রন্থ Where There Is No Doctor-এর লেখক) উদ্যোগে তৃণমূল স্তরে গ্রামের সাধারণ মানুষকে সামিল ও প্রশিক্ষিত করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকে সুরক্ষিত করার উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। লাতিন আমেরিকার অনেকগুলো দেশেই ওয়ার্নারের প্রভাবে জনস্বাস্থ্য আন্দোলন পরিব্যাপ্ত হয়েছিল। আমাদের ভারতে শুরু হয়েছিল জামখেদ আন্দোলন যা পরে জনস্বাস্থ্য অভিযান-এর রূপ নেয়।

একেবারে হালে পৃথিবীর সবচেয়ে মান্য ও চিকিৎসক মহলে সর্বাধিক পঠিত নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ এমন মন্তব্য করা হয়েছে যে আমেরিকা থেকে আগত একজন পর্যটকের কাছে কিউবা “অবাস্তব” এবং “মাথা ঘুরিয়ে দেবার মনে হয়”। হুবহু জার্নালের ভাষায় বললে – For a visitor from the United States, Cuba is disorienting…Cuban health care system also seems unreal. There are too many doctors. Everybody has a family physician. Everything is free, totally free — and not after prior approval or some copay. The whole system seems turned upside down. It is tightly organized, and the first priority is prevention. Although Cuba has limited economic resources, its health care system has solved some problems that ours has not yet managed to address. [আমেরিকা থেকে আগত একজন পর্যটকের কাছে কিউবা মাথা ঘুরিয়ে দেবার মতো…কিউবার স্বাস্থ্য পরিষেবার বিষয়টি কেমন অবাস্তব বলে মনে হয়। প্রত্যেকের একজন করে পারিবারিক চিকিৎসক আছে। সমস্ত কিছু বিনামূল্যে – কোন ইন্সিউরেন্স কোম্পানির আগাম অনুমোদন ছাড়াই। সমস্ত ব্যবস্থাটি মনে হয় আপাদ-মস্তক উল্টে আছে। সমগ্র ব্যবস্থা সুশৃঙ্খলভাবে সংগঠিত, এবং প্রাথমিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রতিরোধ বা প্রিভেনশন-এর ওপরে। যদিও কিউবার অর্থনৈ্তিক সামর্থ্য নিতান্ত সীমিত, এর স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থা এমন কিছু সমস্যার সমাধান করেছে যা আমাদের ব্যবস্থা এখনো নজর করে উঠতে পারেনি।] (Edward Campion and Stephen Morrissey, “A Different Model – Medical Care in Cuba”, New England Journal of Medicine 2013, 368(4): 297-299) কিউবাতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং জনস্বাস্থ্যের ওপরে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মোদ্দা বিষয় হল, ১৯৭০ থেকে ১৯৭৮-এর মধ্যে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের বিভিন্ন রূপ তৈরি হতে থাকে। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৮-এর মধ্যে চীন সোভিয়েট রাশিয়ার সহযোগিতায় এবং আফ্রিকার কয়েকটি দেশের সমর্থনে হু-কে তৃণমূল স্তরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রসারিত করা এবং রোগের ক্ষেত্রে সামাজিক ভূমিকার ব্যাপারে আরো বেশী যত্নবান ও সক্রিয় হবার জন্য চাপ দিতে থাকে। এক গবেষক দেখিয়েছেন (Anne-Emmanuel Birn, “The stages of international (global) health: Histories of success or successes of history?”, Global Public Health 2009, 4(1): 50-68), যদিও সোভিয়েট রাশিয়া ১৯৪৯-১৯৫৭ পর্যন্ত সময়ে হু-র সদস্য ছিলো না কিন্তু হু-র বাৎসরিক বাজেটের ৬% যোগাত এ দেশটি। ১৯৫৯ সালে সদস্য হবার পরে এর পরিমাণ বেড়ে হয় ১৩%।

১৯৭৮ – সকলের জন্য স্বাস্থ্য, ২০০০ সাল একদিকে চীন থেকে কিউবা পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে অর্থপূর্ণ করে তোলার জন্য লাগাতার প্রয়াসের ফলিত চেহারা, হু-র তৎকালীন ডিরেক্টর জেনেরাল ডঃ ম্যালার-এর বিশেষ মতাদর্শগত অবস্থান, আবার অন্যদিকে মুক্ত বাজার অর্থনীতির বর্তমান সর্বগ্রাসী শক্তি ও উপস্থিতির তুলনায় দুর্বলতর অবস্থান এবং একমেরু বিশ্ব না থাকা – সবকিছুর সামগ্রিক যোগফলে ও ফলশ্রুতিতে জন্ম নিল ১৯৭৮-এর Alma-Ata সনদ – Comprehensive Primary Health Care-এর ওপরে। মোট ১০টি অনুচ্ছেদ ও উপ-অনুচ্ছেদে বিভক্ত এই ঘোষণাপত্রে স্পষ্ট ভাষায় বলা হল – “that the attainment of the highest possible level of health is a most important world-wide social goal whose realization requires the action of many other social and economic sectors in addition to the health sector”। অর্থাৎ স্বাস্থ্য-কে অর্জন করা এবং একে রক্ষা করা আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যের মধ্যে একটি এবং এ লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র স্বাস্থ্যের বাইরেও আরো অনেক সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রসঙ্গ জড়িয়ে আছে। এক কথায় বলা যায় স্বাস্থ্য একটি ব্যতিক্রমহীনভাবে রাজনৈতিক বিষয়ও বটে। আরো বলা হল – The people have the right and duty to participate individually and collectively in the planning and implementation of their health care. অর্থাৎ একজন নাগরিকের (প্রজার নয়) প্রতিচ্ছবি এলো ঘোষণাতে।

সাম্প্রতিক সময়ের একটি প্রবন্ধে মন্তব্য করা হয়েছে যে আমেরিকা ইরাকে যুদ্ধের জন্য ১০০ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে প্রস্তুত, কিন্তু এইডস, যক্ষা এবং ম্যালেরিয়ার মোকাবিলার জন্য তৈরী Global Fund-এ মাত্র ১০০ মিলিয়ন ডলার দেয়। (John H Hall, Richard Taylor, “Health for all beyond 2000: the demise of of the Alma-Ata Declaration and primary health care in developing countries”, Medical Journal of Australia 178 (2003): 17-20) এর হাতে গরম উদাহরণ হচ্ছে করোনা অতিমারির এই ভয়ংকর সংকটের সময়েও টাইমস অব ইন্ডিয়া-র খবরের শিরোনাম – US approves sale of missile, torpedoes worth million $155 to India. “জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি”-র মতো ব্যাপার আর কি!

এ সনদে আরো বলা হল – “A genuine policy of independence, peace, détente and disarmam ent could and should release additional resources that could well be devoted to peaceful aims and in particular to the acceleration of social and economic development of which primary health care, as an essential part, should be allotted its proper share.” এ বক্তব্য থেকে নিতান্ত পরিষ্কার হয় যে যুদ্ধখাতে ব্যয়বরাদ্দ স্বাস্থ্যকে সঙ্কুচিত করে এবং প্রথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কার্যকরী করতে হলে শান্তির জন্য প্রচেষ্টাও একটি অর্থপূর্ণ পদক্ষেপ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, যুদ্ধখাতে ব্যয়-বরাদ্দ কমিয়ে জনকল্যাণমূলক ক্ষেত্রে ব্যয় বাড়ানোর মতো ঘোরতর রাজনৈতিক বার্তাও ছিলো এ ঘোষণাপত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট।

মুশকিল হচ্ছে তেলের এবং খনিজ সম্পদের বাজারের জন্য সমগ্র পশ্চিম এশিয়া ও মিশর অশান্ত হয়ে না উঠলে যুদ্ধাস্ত্র বিক্রীর বিপুল মুনাফা হয় না। স্বাস্থ্য এখানে দুয়োরাণীর-ও অধম যে! এজন্য এরকম সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সনদপত্র মুক্ত বাজারের প্রবক্তাদের পক্ষে হজম করা অসম্ভব একটি ঘটনা।

২০২০-র পৃথিবী করোনা আমাদের সচকিত করে এ কঠোর সত্যের সামনেও দাঁড় করিয়ে দিল – তথাকথিত গণতান্ত্রিক এবং এক-পার্টি ব্যবস্থার দেশের মধ্যে সত্যিই কি কার্যত কোন ফারাক আছে? ধরে নিচ্ছি চিন করোনার তথ্য গোপন করেছে। স্পষ্টতই আমি য়ুহান ভাইরাসের মতো অবান্তর বিষয় নিয়ে কিছু বলছিনা। নেচার মেডিসিনের মতো পত্রিকায় প্রকাশিত “The proximal origin of SARS-CoV-2” প্রবন্ধটি দেখে নিতে অনুরোধ করছি। আরেকদিকে পৃথিবীর “গণতান্ত্রিক” বড়দা আমেরিকার অধীশ্বর ট্রাম্প সাহেব ১৯ মার্চ ঘোষণা করে দিলেন হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন হল “game changer’ – খেলা ঘুরিয়ে দেবার মতো ওষুধ। কি সব্বোনাশ! পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন Anthony Fauci-র মতো আন্তর্জাতিকভাবে মান্য চিকিৎসক – যিনি নিউ ইংল্যান্ড জার্নালে আমন্ত্রিত সম্পাদকীয় লেখেন, হ্যারিসনের টেক্সট বুকের অন্যতম সম্পাদক এবং ৪০ বছরের বেশি সংক্রামক ব্যাধি নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। তাঁকে সর্বসমক্ষে দম্ভভরে স্রেফ চুপ করিয়ে দিলেন। কোন কথাই ফসি বলতে পারলেন না। এমনটাতো হিটলারের বা অন্য কোন একনায়কের আমলে হয়ে থাকে। ভারতেও বোধহয় একথা ভাবা যায়না।

ট্রাম্পের হঠাৎ করে এরকম হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন প্রীতির কারণ কী? জার্মানির চ্যান্সেলর মার্কেল একজন ট্রেইনড বিজ্ঞানী। ট্রাম্প একজন অতি বিত্তশালী ধুরন্ধর ব্যবসায়ী। তিনি ওষুধ নিয়ে এত জানলেন কি করে? ২১ মার্চ টুইট অব্দি করে ফেললেন – HYDROXYCHLOROQUINE & AZITHROMYCIN, taken together, have a real chance to be one of the biggest game changers in the history of medicine. The FDA has moved mountains – Thank You! Hopefully they will BOTH (H works better with A, International Journal of Antimicrobial Agents)। এর পেছনে কাজ করছে অতি সরল বাণিজ্যিক লাভের প্রশ্ন। এবং ট্রাম্পের টুইটের পরে আমেরিকার স্বশাসিত মান্য সংস্থা এফডিএ ব্যতিক্রমীভাবে Emergency Use Authorization (EUA) এ ওষুধগুলোর সীমাবদ্ধ ব্যবহারকে অনুমোদন দিল। আমেরিকার ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথ ট্রায়াল শুরু করে দিল। এগুলোকে ঠিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বলা যাবে কি? নাকি একটি একদলীয় শাসনের আরেকটি রকমফের? Vox News-এর সংবাদ অনুযায়ী (৭.০৪.২০২০) – Trump appears to have been convinced of the drug’s effectiveness by its advocates in his inner circle, including trade adviser Peter Navarro and his personal lawyer Rudy Giuliani, as well as by a French study that indicated the drug is effective against the virus — but that, as Vox’s Umair Irfan has explained, came with a number of caveats the president may have missed, and that has been retracted. শুধু তাই নয়, “the report of Trumpworld’s connections to the pharmaceutical industry caused many to believe something more sinister was afoot — namely, that Trump hoped to use the coronavirus pandemic to enrich himself and his allies.”

একইসাথে আমেরিকায় জাতি বৈরিতা, বিশেষ করে এশিয়ান এবং আফ্রো-আমেরিকান্দের ক্ষেত্রে, বেড়ে চলেছে। নেচার পত্রিকায় (৭.০৪.২০২০) সম্পাদকীয় লেখা হচ্ছে – Stop the coronavirus stigma now। বলা হচ্ছে – It’s clear that since the outbreak was first reported, people of Asian descent around the world have been subjected to racist attacks, with untold human costs — for example, on their health and livelihoods. Law-enforcement agencies say they are making investigation of hate crimes a high priority, but such inquiries might come too late for some, including many of the more than 700,000 Many have returned home while their institutions are closed owing to lockdowns, and many might not return.

আমরা এই সময়ের সাক্ষী। প্রায় সবকিছুকেই আমরা রাষ্ট্রের নির্ধারিত বিধি অনুযায়ী বুঝতে এবং জানতে শিখেছি। অন্য পথে ভাবার অভ্যেস আমরা হারিয়ে ফেলছি। কাম্যুর বিখ্যাত উপন্যাস প্লেগের ডাক্তার রু (Rieux) কাল্পনিক ওরান শহরে প্লেগের মহামারির পরে বলেছিলেন – I have no idea what’s awaiting me, or what will happen when this ends. বলেছিলেন – For the moment, I know this: they are sick people and they need curing. হ্যাঁ, আমাদের এই কাজটি করতে হবে। কিন্তু কি ঘটতে পারে সেটা তিনি না জানলেও এই কুটিল এবং ভয়াল সময়ে আমাদের জেনে নেওয়া জরুরি। তাই এত কথা বলা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here