ওয়েব সিরিজ রিভিউ : ‘পাতাললোক’

0
34

শুধু নরক নয়, স্বর্গ ও পৃথিবীর মানুষের মুখোশগুলোতেও টান মারে পাতাললোক

অভিনয় : জয়দীপ আহলাওয়াত,  নীরজ কবি, অভিষেক ব্যানার্জি, ইশ্বাক সিং, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়,  গুল পনাগ, নিহারিকা লায়রা দত্ত, বোধিসত্ত্ব শর্মা

পরিচালনা : অবিনাশ অরুণ,  প্রসিত রায়

রেটিং : ৪/৫

দেবলীনা ব্যানার্জী : সাদা ও কালো, ভালো ও মন্দ, স্বর্গ ও  নরক (পাতাল), বিভাজন এভাবেই আমরা করে থাকি। তবে এই বিভেদ ঠিক কতটা যুক্তিযুক্ত আজকের সময়ে? ‘পাতাললোক’ দেখে এই প্রশ্ন উঠতে বাধ্য আপনার মনে। পুরাণ থেকেই আমরা পাতাল শব্দের সাথে পরিচিত। চলতি ভাষায় একে নরক বলে থাকি। নরকে কারা থাকে?

গল্পের শুরুতেই মুখ্য চরিত্র হাতি রাম চৌধুরী (জয়দীপ আহলাওয়াত) তার নবাগত অধস্তন আনসারিকে (ইশ্বাক সিং) বলে দুনিয়া আসলে একটা নয়, তিনটে। সবচেয়ে উপরে স্বর্গলোক, যেখানে দেবতারা থাকেন। মাঝখানে ধরতী ( পৃথিবী)  লোক, যেখানে মানুষ থাকে। আর সবচেয়ে নীচে পাতাললোক, যেখানে নরকের কীটরা থাকে। এই উক্তির সাথে গল্পে প্রবেশ করামাত্রই ধারণা জন্মে যায় আসলে কোন দিকে যেতে চলেছে ঘটনা।

অনুষ্কা শর্মার প্রযোজনায় অবিনাশ অরুণ ও প্রসিত রায়ের মত দুর্দান্ত পরিচালকের হাতে তৈরি এই সিরিজে এরপর থেকেই দর্শক ধীরে ধীরে পৌছে যায় পাতালের অন্ধকার জগতে। পাতাললোকের গল্প খুব সহজ সরলভাবে বর্তমান সময়ের প্রত্যেকটা জ্বলন্ত সমস্যাকে ছুঁয়ে গেছে। ধর্ম, বর্ণ, রাজনীতি, সংবাদমাধ্যম,  ট্রোলিং, বেড হপিং, অপরাধজগৎ, দূর্নীতি,  ক্ষমতার খেলা সব আছে এখানে।

কিন্তু তাও দর্শক ভারাক্রান্ত হয় না,বরং একের পর এক এপিসোড যত এগোতে থাকে, দর্শক একাত্ম হয়ে পড়ে সবকিছুর সাথে। সুদীপ শর্মা যিনি এর আগেও ‘উড়তা পঞ্জাব’,  ‘এন এইচ টেন’ এর মত ছবির গল্প লিখেছেন এখানেও নিজস্ব মুন্সিয়ানায় গল্পকে বিশ্বাসযোগ্য ভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। গল্পের শুরুতেই এক নামজাদা সাংবাদিক তথা সঞ্চালককে খুনের ষড়যন্ত্রের দায়ে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। দিল্লির আউটার যমুনা থানার পুলিশ অফিসার হাতি রামের ওপর ভার পড়ে এর তদন্তের।

দীর্ঘদিনের চাকরি জীবনে এই প্রথম এত বড় কেসের দায়িত্ব পায় হাতি রাম। সহকারী আনসারিকে নিয়ে অনভ্যস্ত পদক্ষেপই এগোতে থাকে হাতি রামের তদন্ত।  সামনে আসে একের পর এক সত্যের পেছনের চরম সত্য। অন্যদিকে বাড়িতে তাঁর স্ত্রী রেনু (গুল পনাগ) সংসার সামলায় আর ছেলে সিদ্ধার্থ (বোধিসত্ত্ব শর্মা) বাবার প্রত্যেক কথায় অবাধ্যতা করে। স্কুলে ও বন্ধুদের কাছে উল্টোপাল্টা কমেন্ট শুনে অবাধ্য মন আরো বেশি করে বাবার প্রতি বিরূপ হয়।

পেশার জগৎ ও সংসার দুদিক থেকেই অসফল হাতি রাম হেভিওয়েট একটা কেস পেয়ে মরিয়া হয়ে ওঠে অন্তত একবার সাফল্যকে সামনাসামনি দেখার জন্য। আরেক মুখ্য চরিত্র একদাসফল সাংবাদিক সঞ্জীব মেহরা ( নীরজ কবি) বর্তমানে নিজের চাকরি বজায় রাখতে মরিয়া। এরকম টালমাটাল পরিস্থিতিতে তাঁকে খুনের ষড়যন্ত্র সামনে আসে। হাতি রামকে বলা সঞ্জীবের একটি উক্তি,  ‘সাংবাদিকেরা একসময় হিরো ছিল, আর এখন আমরা ট্রোল হই, খুন হই, চাকরি থেকে বার করে দেওয়া হয়।’ গৌরী লঙ্কেশের পরিনতিকে খুব সাবধানে ছুঁয়ে যাওয়ার চেষ্টা দেখা যায় এই সংলাপের সাথে।

‘পাতাললোক’ এর আরেকটা বিশেষত্ব অতি অবশ্যই এর অভিনেতা অভিনেত্রীরা। এই সিরিজে কোনো বড় মাপের তারকা অভিনেতা নেই, যারা আছেন তাদেরকে এর আগে আমরা সিনেমা, টিভি শো বা সিরিজে সহ অভিনেতা হিসেবে দেখেছি এবং তাদের কাজ পছন্দ করেছি। মুখ্য চরিত্রে জয়দীপ আহলাওয়াত,  নীরজ কবি,  ইশ্বাক সিং, অভিষেক ব্যানার্জি ফাটিয়ে অভিনয় করেছেন। বিশেষ করে চারজন ষড়যন্ত্রকারীর মধ্যে বিশাল ওরফে হাতোড়া ত্যাগী তাঁর হাড় হিম করা চাহনি দিয়ে দর্শকের রক্ত জমিয়ে দিতে একশো শতাংশ সার্থক।  হাতোরা ত্যাগীর সংলাপ তেমন নেই বললেই চলে,  শুধুমাত্র এক্সপ্রেশন ও চাহনি দিয়েই তিনি মাত করেছেন।

সাংবাদিক সঞ্জীব মেহরার উদ্বেগগ্রস্ত স্ত্রী ডলির চরিত্রে স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় বেশ ভালো।  হাতি রামের স্ত্রী রেনুর তেমন বিশেষ কিছু গল্পে করার না থাকলেও নিজের চরিত্রে গুল পনাগ বিশ্বাসযোগ্য। ছেলে সিদ্ধার্থর চরিত্রে বোধিসত্ত্ব শর্মাও প্রশংসনীয় কাজ   করেছেন। একজন বাচ্চা ছেলে যে বাইরে আজেবাজে কথা শোনে, বাবাকে পছন্দ করে না। এমন চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে যথেষ্ট মুন্সিয়ানার প্রয়োজন,  যার কোনো খামতি বোধিসত্ত্বের অভিনয়ে ছিল না। তরুণী সঞ্চালিকা সারার চরিত্রে নিহারিকা লায়রা দত্তও যথেষ্ট ভালো।

সিরিজে প্রত্যেক চরিত্রের নিজস্ব গল্প আছে, সবার গল্পই এক এক করে দর্শকের সামনে এসেছে। ‘পাতাললোক’ এর পটভূমি মূলত দক্ষিণ দিল্লি ও ধুলোমাখা পঞ্জাবের গ্রামাঞ্চল। অসাধারণভাবে গল্পে জায়গা করে নিয়েছে চিত্রকূট। পুরাণ অনুযায়ী এই সেই প্রাচীন  জায়গা যেখানে নাকি লঙ্কা যাওয়ার পথে রামচন্দ্র বিশ্রাম নিয়েছিলেন। লকডাউনের অবসরে দেখার জন্য অসংখ্য সিরিজ ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোতে ভিড় করে আছে।

তার মধ্যে ‘পাতাললোক’ অবশ্যই দেখার মত একটা সিরিজ, যেখানে বর্তমান সময়ের জ্বলন্ত সমস্যাগুলোকে কিছুটা বেআব্রু করেই দেখানো হয়েছে।  নির্মম কিছু দৃশ্য চোখ বন্ধ করতে বাধ্য করেছে। কিন্তু বাস্তবকে এখানে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। সবশেষে বলি এই সিরিজে শুধু পাতাললোকের পরিস্থিতি দেখানো হয়নি, পৃথিবীলোকের মানুষের সমস্যাগুলোও সামনে এসেছে। আর দেখানো হয়েছে স্বর্গলোককে আমরা যতটাই সুন্দর ও পবিত্র মনে করি, আসল সত্য কিন্তু তা থেকে অনেক আলাদা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here