রক্ত দিয়ে ‘অক্ষর’ গাঁথা

0
36

শিল্পী দাসঃ আজ মাতৃভাষার দিন, জন্মের পর থেকে একটা ছোট্ট শিশুর কান যে ভাষাতে অভ্যস্ত হয়ে কালক্রমে তা মুখের বুলির রূপ নেয়, সেটাই সেই শিশুটির মাতৃভাষা। এই দিনটির মর্মবিদারী প্রেক্ষাপটে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে ১৯৫২ সালের বাংলাদেশ,আর তার বীরদর্পী তরুণ শহীদের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত অশ্রুবিদগ্ধ স্মৃতি। যার ফলস্বরূপ উঠে আসে ১৯৯৯ সালের ১৭ ই নভেম্বর, ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশন, যেখানে এই “অমর একুশে”কে “আন্তজার্তিক মাতৃভাষার দিন” বলে উদযাপন করার দৃষ্টান্ত গড়ে তোলা হয়।

তারপর থেকে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক ভাষাদিবস পালনের কর্মসূচি চলে আসছে নিয়ম মেনে।আজ বাঙালির দিন বললেও অত্যুক্তি হবে না,কেননা এই ভাষার সম্মান রক্ষার্থেই তো ছিল সেই ১৯৫২ এর একুশের বলিদান। বাংলা ভাষা আমাদের আত্মমর্যাদাশীল করে তোলে,মাথা উঁচু রেখে গর্ব করে বলতে শেখায়, “আ-মরি বাংলাভাষা”।

অথচ আমরা আজ অনেকেই আকছার (হয়তো অজান্তেই) ভুল করে বলে বসছি,”#গর্বিত বাংলা মিডিয়াম”। কথাটার তর্জমা ভালো করে লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে, কথাটার অপ্রাসঙ্গিকতা ঠিক কতখানি!মিডিয়ামের বাংলা অর্থ “মাধ্যম” তা কি জানি না? তবে?! এখানেই ভাবতে হবে। বাঙালি, বাঙালিয়ানা, আভিজাত্য -এসব দেখানোর জন্য এই একটা দিনকে কেন্দ্র করে এতটা অহেতুক আড়ম্বর কখনোই শোভা পায় না। আজ আমাদের কারো কাছে সেই দিন,যে দিনে সে মজা করার জন্য খুঁজে নিচ্ছি কোনো ‘ইংলিশ মিডিয়ামে’র বাঙালি বন্ধুকে।

আমরাই আবার দিদা ঠাকুমার বাঙাল ভাষা নিয়ে মজা করছি, অথচ কি স্বচ্ছন্দে গেয়ে চলেছি, “ভাইয়ের রক্তে রাঙানো….”। বাড়ির সাদাসিধে কাজের মেয়েটির প্রান্তিক গ্রাম্য ভাষাকে বিকৃতি করে মাথা নেড়ে কৌতুক বা মকশো করাচ্ছি এই আমরাই, জলকে “পানি” বলতে শুনলে ছুঁতমার্গ হয়ে পড়ছি নিজেদের স্বাভাবিক অভিব্যক্তিকে আড়াল করে দিয়ে।

ভাষা একটা সেতু, দুই বা ততোধিক সমাজবদ্ধ জীবের ভাব বিনিময়ের একটা বাহন হলো যেযার নিজস্ব ভাষা। ভাষা শ্রদ্ধা জানাতে শেখায়, অভিবাদন করতে বলে, ভাষার মাধ্যমে আমরা নিজেদের সংস্কৃতির পরিচয় দিয়ে থাকি, আঞ্চলিকতাকে তুলে ধরি অন্য ভাষাভাষীর সামনে। এক ভাষা অন্য ভাষাকে অবমাননা করার মতো ঘৃণ্য মানসিকতার প্রশ্রয় কখনই দেয় না, বাঙালিদের তো নয় ই। আমি বাঙালি,বাংলায় ভাব বিনিময়ে স্বচ্ছন্দবোধ করি। তার মানে এই নয় যে অন্য ভাষায় (ইংরেজি বা হিন্দি বা আঞ্চলিক কোনো ভাষা বা গ্রাম্য ভাষা) কথা বলতে আসা মানুষদের শুধুমাত্র ভাষা দিয়ে মেরুকরণ করে দেবো।

আমাদের সামাজিক ও ব্যবহারিক প্রয়োগের খাতিরে অবশ্যই ইংরেজি বা হিন্দি শিখবো,বুঝতে চাইবো। কিন্তু জোর খাটানো শোভা পায় না।কারুর উপরে কোনো নির্দিষ্ট ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়া কিন্তু অনৈতিক। মনে রাখতে হবে,ভারতীয় সংবিধানে কোথাও কোনো রাষ্ট্রভাষা বলে আলাদা কিছু নেই,সব ভাষাই সমান মর্যাদাপ্রাপ্ত,”বিবিধের মাঝে মিলন”। ভাষা দিয়ে জাতির সংজ্ঞা দেওয়া অবশ্যই যেতে পারে,কিন্তু ‘জাত’ কখনোই নয়।

International Mother Language Day, 2020 এর থিমে বলা আছে,””Languages without borders”. The theme focuses on cross-border languages and helps to preserve indigenous heritage.” আমরা সীমানার যে পাড়েই থাকি না কেন, যে সাংস্কৃতিক ঘেরাটোপে মুড়ে থাকিই না কেন, নিজের মাতৃভাষাকে রোজ, প্রতি মুহূর্তে, প্রতিনিয়ত সম্মান দেবো।বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করবো; কিন্তু সেসব অন্যের “মা”কে অসম্মানিত, অপমানিত না করেই। আজ যে গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো না করলেই নয়,তাই আবারও বলি -“নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান,বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান্ ; দেখিয়া ভারতে মহা-জাতির উত্থান—জগজন মানিবে বিস্ময়!”

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here