নভেল করোনা ভাইরাস – আন্তর্জাতিক আতঙ্কের এক নতুন নাম

0
51
ফাইল ছবি

ডঃ জয়ন্ত ভট্টাচার্যঃ বিশ্ব স্বাস্থ্যসস্থা তথা WHO করোনা ভাইরাস চিনের সংক্রমণকে আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগজনক জনস্বাস্থ্যের আপতকালিন অবস্থা (Public Health Emergencies of Internstional Concern) বলে ঘোষণা করেছ। কারণ করোনা ভাইরাসের আক্রমণ আর শুধু চিনে সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীর ২০টি দেশে ছড়িয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ইত্যাদি সব দেশই রয়েছে আক্রান্তের তালিকায়। বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনে ৩১শে জানুয়ারিতে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী বিজ্ঞানীরা এখনো বুঝে উঠতে পারছেন না কতদিন অব্দি এই সংক্রমণ চলতে পারে। খাবার থেকে এবং মানুষের সাথে সংযোগ দুভাবেই সংক্রমণ ছড়াচ্ছে।

ফাইল ছবি

৩০শে জানুয়ারি, ২০২০-র সর্বশেষ খবর অনুযায়ী কেরালাতে একজনের দেহে নিশ্চিতভাবে করোনা ভাইরাস তথা নভেল করোনা ভাইরাস পাওয়া গেছে। এদিন সকালের নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর খবর অনুযায়ী – এখনো পর্যন্ত চিনের য়ুহান প্রদেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ১৭০ বা তার কিছু বেশি, ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৭,৭০০-র বেশি। এখনও অনেকটা রহস্যময় এই ভাইরাস রহস্য। উল্লেখ করার মতো যে ২০০২-২০০৩ সালে SARS-এর যে সংক্রমণ চিন সহ দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়া তথা সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়েছিল করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা শুধু চিনেই এখনও অব্দি তার চেয়ে বেশি।

WHO-র দেওয়া হিসেব অনুযায়ী, SARS-এর আক্রমণে ১৭টি দেশে ৭৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫,৩২৭। কিন্তু করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৭,৭০০ ছাড়িয়ে গেছে ডিসেম্বর মাসে সংক্রমণ শুরু হবার এক মাসের মধ্যে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হল গত ৩-৪ দিনের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যার বৃদ্ধি ৩০%-এরও বেশি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা অনুমান করছেন প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ দ্রুত পরীক্ষা করার মতো test kit-এর ঘাটতি পড়েছে। এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতের হার এখনও পর্যন্ত হিসেব অনুযায়ী শতকরা ৩ জন (৩%)। WHO-র সর্বশেষ খবর অনুযায়ী – Over 9200 additional novel coronavirus cases in China are suspected, the WHO reports. There have been 132 related deaths, all in China. Outside of China, 68 cases have been confirmed. A WHO committee will reconsider whether to declare a Public Health Emergency of International Concern (PHIC) on Thursday.

চিকিৎসার জগৎ এ ভাইরাস নিয়ে কি বলে?

(করোনা ভাইরাস – চারপাশে সূর্যের ছটার মতো – এজন্য এই নাম) ২৪ জানুয়ারি, ২০২০, নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এর সম্পাদকীয় হল – Another Decade, Another Coronavirus। এ ভাইরাসকে আপাতত 2019-nCoV নামে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ২০০২-৩-এর SARS (severe acute respiratory syndrome – SARS-CoV) এবং ২০০৯-এর MERS-CoV (Middle East respiratory syndrome coronavirus)-এর এটা তৃতীয় অতিবৃহৎ সংক্রমণ। করোনা ভাইরাস একধরনের RNA virus। RNA virus হবার জন্য এই ভাইরাস সহজেই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নতুন করে সংক্রমণ ছড়াতে পারে কারণ এতে আছে “error-prone RNA-dependent RNA polymerases” যার ফলে “mutations and recombinations” খুব ঘন ঘন হতে পারে। আরেকটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হল শুষ্ক শ্বাসনালীর উপরিস্তরের কোষে (epithelium) এরা সহজে বেঁধে যেতে পারে। এজন্য চিকিৎসকেরা বারেবারে অল্প অল্প জল (১০০ মিলি পর্যন্ত) পান করতে বলেন, যাতে গলা এবং শ্বাসনালী শুকিয়ে না যায়। এবং অবশ্যই সংক্রমণের পরিস্থিতি তৈরি হলে তবেই এ নির্দেশ পালন করার কথা, সাধারণ অবস্থায় নয়।

এছাড়াও যেগুলো সহজে পালন করা যায় এবং গুরুত্বপূর্ণ সেগুলো অল্প কথায় বললে – (১) সাবান আর পরিস্কার জল দিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধুয়ে ফেলতে হবে। সাবান না থাকলে অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে ব্যবহার করতে হবে। (২) হাত পরিস্কার না করে চোখ-মুখ-নাকে হাত দেওয়া অনুচিত। (৩) হাঁচি কাশি পেলে রুমাল বা টিসু পেপার ব্যবহার করুন এবং একবার ব্যবহারের পরে রুমাল হলে ভালো করে সাবান জলে ধুয়ে নিতে হবে, টিসু পেপার হলে ফেলে দিন। (৪) নাক মুখ ঢাকা মাস্ক ব্যবহার করুন। অসুস্থ রোগীদের কাছে যাওয়া পরিহার করুন। (৫) প্রতিদিনের অবশ্য ব্যবহার্য জিনিসগুলি বারবার পরিস্কার করতে হবে, জীবাণুমুক্ত করতে হবে। (৬) নিজের মধ্যে অসুস্থতার লক্ষ্মণ দেখা গেলে নিজেকে ঘরবন্দী করে রাখুন।

চিকিৎসাবিজ্ঞান এখনও জানেনা ঠিক কিভাবে মানুষের দেহের ভেতরে কোষের সাথে এই ভাইরাস জোড় বাঁধে এবং সংক্রমণ শুরু করে। জানেনা সংক্রমণ নিয়েও কিভাবে একজন মানুষ একেবারেই কোন উপসর্গহীন অবস্থায় থাকতে পারে, আবার একজন মরে যায়। যদিও মনে রাখা দরকার যারা মারা গেছে তাদের এক বড় সংখ্যক বার্ধক্য, টিবি, ডায়াবেটিস বা অন্য কোন ধরনের অসুখে যা শরীরের ইমিউনিটিকে দুর্বল করে দেয় সেরকম অসুখে ভুগছিল। কিন্তু য়ুহানের রিপোর্ট থেকে বোঝা যাচ্ছে বড়ো সংখ্যক রোগীর মৃত্যু ঘটেছে মাল্টি অরগ্যান ফেইলিওরের ফলে। ২৯ জানুয়ারি, ২০২০-এ ল্যান্সেট পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট বলছে – The 2019-nCoV infection … is more likely to affect older males with comorbidities, and can result in severe and even fatal respiratory diseases such as acute respiratory distress syndrome. একই দিনে ল্যান্সেট-এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণার শিরোনাম “Genomic characterisation and epidemiology of 2019 novel coronavirus: implications for virus origins and receptor binding”। এখানে জিন স্টাডি করে দেখা যাচ্ছে যে ভাইরাসের উৎস, আগের দুবারের মতো্‌, খুব সম্ভবত বাদুর – 2019-nCoV is sufficiently divergent from SARS-CoV to be considered a new human-infecting betacoronavirus. Although our phylogenetic analysis suggests that bats might be the original host of this virus, an animal sold at the seafood market in Wuhan might represent an intermediate host facilitating the emergence of the virus in humans.

করোনা ভাইরাসের সময় সারণীঃ

● ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে করোনা ভাইরাসের খবর আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় পৌঁছয়। চিন সরকার দ্রুত এ খবর WHO-র কাছে পাঠায় উপযুক্ত পদক্ষেপ নেবার জন্য।

● ৩০ জানুয়ারি, ২০১৯, ওয়াশিংটন পোস্ট-এর সংবাদ অনুযায়ী মোট ১৮টিরও বেশি দেশে এ রোগ আক্রমণ করেছে। সংখ্যা অনুযায়ী – চিনঃ ৭,৭০০; থাইল্যান্ডঃ ১৪; হংকংঃ ১০; তাইওয়ান, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াঃ প্রত্যকেওক্ষেত্রে ৭-৮ জন করে; আমেরিকাঃ ৫; অস্ট্রেলিয়াঃ ৫; সৌদি আরবঃ ৪; ফ্রান্সঃ ৪, জার্মানিঃ ৪, ইত্যাদি।

● ওয়াশিংটন পোস্টের ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৯-র খবর জানাচ্ছে – Experts debunk fringe theory linking China’s coronavirus to weapons research।

● ২৭ জানুয়ারি, ২০২০, অস্ট্রেলিয়া কৃত্রিমভাবে নভেল করোনা ভাইরাস তৈরি করতে সফল হয়েছে। ফলে ভবিষ্যৎ গবেষণার সুবিধে হবে।

● কিন্তু এক ভাইরাসের গুঁতোয় বিশ্বসুদ্ধ গেল গেল রব পড়ে গেছে – কি মেডিসিনে, কি পর্যটনে, কি বিশ্ব অর্থনীতিতে। একেই বলে গ্লোবালাইজেশন – “আওয়াজ খানা দিচ্ছে হানা দিল্লী থেকে বর্মা”।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here