“অভিনেতাকে টাইপকাস্ট করা হলে প্রতিভার সঠিক মূল্যায়ন হয় না” : দেবপ্রসাদ হালদার

0
62

সৃজিত মুখার্জির ‘বাইশে শ্রাবণ’ এর ছোট্ট একটা চরিত্র থেকে অভিনয়ের শুরুটা হয়েছিল। তারপর মৈনাক ভৌমিক, কমলেশ্বর মুখার্জি, অরিন্দম শীলের মত পরিচালকদের সঙ্গে ইতিমধ্যেই কাজ করা হয়ে গেছে। সম্প্রতি হইচই প্ল্যাটফর্মে ‘দ্য কেবিন গার্ড’ এ সাইকো কিলার চিন্ময় পালিতের চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করে রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছেন দেবপ্রসাদ হালদার। অভিনেতা নিজেও বলছেন এতদিনে এই চরিত্রটিই তাঁকে অভিনয়ের তৃপ্তি এনে দিয়েছে। এমন চরিত্রই করতে চান যা তাঁকে নিত্যনতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারবে। নিংড়ে বের করতে পারবে সেরা কাজকে।ইন্ডাস্ট্রিতে টাইপকাস্ট হয়ে যাওয়াকে প্রচন্ড ভয় পান অভিনেতা দেবপ্রসাদ। পছন্দের পরিচালক, সহ অভিনেতা ও  কাজ সম্পর্কে অকপটে জানালেন মনের কথা। শুনলেন আমাদের প্রতিনিধি দেবলীনা ব্যানার্জী

দেবলীনা : অভিনয়ের শুরু কিভাবে হয়েছিল?

দেবপ্রসাদ : অভিনয়ের চেষ্টা শুরু ২০১০ সাল থেকে। ২০১১ তে আমি টেলিভিশনে কিছু ছোটখাটো কাজ করি। ২০১২ তে আমার প্রথম ছবি ‘ বাইশে শ্রাবণ ‘। ওখানে আমি ছোট একটা চরিত্রে কাজ করি। তারপর থেকেই একের পর এক ছবি পাওয়া ও করতে থাকা। মৈনাক ভৌমিক,  সৃজিত মুখার্জি, অরিন্দম শীল, কমলেশ্বর দা সবার সাথেই সৌভাগ্যবশত কাজ করা হয়ে গেছে।

দেবলীনা : ওয়েবে এখনো পর্যন্ত কি কি কাজ করেছেন?

দেবপ্রসাদ : ওয়েবে আপাতত তিনটে কাজ করা হয়েছে। ওয়েবে প্রথম কাজ ছিল দেবালয় ভট্টাচার্যের ‘চরিত্রহীন’। হইচইতে চরিত্রহীন প্রথম সিজনটায় একটা ছোট চরিত্রে কাজ করেছি। তারপর করলাম ‘ দ্য কেবিন গার্ড’ সুদীপ্ত রায়ের পরিচালনায়। ছবিতে আমি কেবিন গার্ডের চরিত্রটি করেছি। একজন সাইকো কিলারের চরিত্র। একজন ফ্যামিলিম্যান কিন্তু তার মধ্যে কিছু সাইকোটিক সমস্যা রয়েছে যা বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না। সেখান থেকেই তার খুন, হিংসা এইসমস্ত সমস্যার জন্ম হয়। এরপরেও হইচইতে ‘অদ্ভুতুড়ে’ বলে একটা সিরিজ হয়েছে। ওখানে একজন প্রফেসরের ভূমিকায় আমি অভিনয় করেছি। ওটাও নেগেটিভ চরিত্র,  যদিও প্রথম থেকে বোঝা যাবে না।

দেবলীনা : এইমূহূর্তে কি কি ছবির কাজ চলছে?

দেবপ্রসাদ : এইমূহূর্তে ‘ভটভটি’ বলে একটা ছবি চলছে তথাগত মুখার্জির পরিচালনায়। শ্যুটিং প্রায় শেষ,  আর একদিনের শ্যুটিং বাকি আছে। এরপর সত্যজিৎ দাসের ‘ আবার অপু ও দুর্গা ‘ আছে। অরিন্দম গোস্বামী বলে একটা নতুন ছেলে খুব ইন্টারেস্টিং একটা কনসেপ্ট নিয়ে এসেছিল আমার কাছে। সেই ছবিটিও শুরু হচ্ছে। ছবির নাম ‘বাহ্মী’ ( brahmi)  যার অর্থ শক্তি। এই ছবিটির শ্যুটিং খুব শিগগিরই মুর্শিদাবাদে শুরু হওয়ার কথা।

দেবলীনা : যেহেতু টেলিভিশন,  সিনেমা,  ওয়েব তিন মাধ্যমেই আপনার কাজ করা হয়ে গেছে,  তাই জিজ্ঞেস করছি এই তিন মাধ্যমে কাজের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য আছে কি?

দেবপ্রসাদ : পার্থক্য অবশ্যই আছে। আসলে তিনটে মাধ্যমের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, পার্থক্য যেটা আছে সেটা টেলিভিশন আর সিনেমার মধ্যে। ওয়েব আর সিনেমার শ্যুটিংয়ের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই। টেকনিকালি কিছু পার্থক্য থাকলেও অভিনয়ের ক্ষেত্রে ওয়েব আর সিনেমায় কোনো বিভেদ নেই। অন্তত আমার কাজ করে তাই মনে হয়েছে।

দেবলীনা : এর মধ্যে আপনি কোন মাধ্যমে কাজ করতে স্বচ্ছন্দ? 

দেবপ্রসাদ : অবশ্যই সিনেমা এবং ওয়েবেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য। সিনেমা বা ওয়েবে অভিনয় করে যে মজাটা আসে সেটা আমি টেলিভিশনে অভিনয় করে পাইনি। টেলিভিশনের অনেক রকম বাধ্যবাধকতা থাকে। চরিত্র নিয়ে নিজের মত করে ভাবনাচিন্তা করার কোনো জায়গা নেই টেলিভিশনে। ছবি বা ওয়েবে চরিত্রকে নিজের মত করে তৈরি করার সে জায়গাটা পাওয়া যায়। অনেক স্বাধীন ভাবে কাজ করা যায় সিনেমা বা ওয়েবে, যেটা টেলিভিশনের ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না।

দেবলীনা : এখনো পর্যন্ত যে ছবিগুলো করেছেন তার মধ্যে নিজের পছন্দের লিস্ট যদি তৈরি করতে হয়, কোন কোন ছবির নাম থাকবে?

দেবপ্রসাদ : আমার জীবনের প্রথম কাজ ‘বাইশে শ্রাবণ ‘ অবশ্যই পছন্দের লিস্টে থাকবে। আর একটি খুব পছন্দের কাজ মৈনাক ভৌমিকের ‘আমি আর আমার গার্লফ্রেন্ডস’। প্রচন্ড প্রিয় চরিত্র ও পছন্দের কাজ সুদীপ্ত রায়ের ‘দ্য কেবিন গার্ড’। অনেক রকমের অদ্ভূত শেডস ছিল এই চরিত্রটায়। এছাড়াও অনেক ভালো ছবি ও ভালো চরিত্র করেছি। কিন্তু খুব কাছের প্রিয় চরিত্র বলতে হলে এই তিনটি ছবির নামই বলব।

দেবলীনা : টেলিভিশনের উল্লেখযোগ্য মনে রাখার মত কাজ? 

দেবপ্রসাদ : কালার্স বাংলায় ‘চৈতন্য’ বলে একটা সিরিয়াল হত।  সেখানে প্রথম এপিসোড থেকেই আমার একটা চরিত্র ছিল ‘কালা’ নামে। চৈতন্যর পাশাপাশি একটা অশুভ বা দুষ্ট চরিত্র কালা, যার জন্ম, মৃত্যু,  বয়সের বৃদ্ধি কিছুই নেই। কালার ট্র‍্যাকটা অনেকদিন ধরেই সিরিয়ালে ছিল। তারপর যা হয় চৈতন্যর শুভ শক্তি বিজয় পায় সেই অশুভ শক্তির ওপর। তবে ওই চরিত্রটা করে বেশ মজা পেয়েছিলাম। সচরাচর টেলিভিশনে এরকম চরিত্র দেখা যায় না। টেলিভিশনে এটাই একমাত্র কাজ যেটা আমার পছন্দের কাজের মধ্যে উল্লেখ করতে পারি।

দেবলীনা : অনেক বড় বড় পরিচালকদের সঙ্গে ইতিমধ্যেই কাজ করা হয়ে গেছে,  তাদের মধ্যে কার কার সাথে আবার কাজ করতে চান?

দেবপ্রসাদ : ‘দ্য কেবিন গার্ডের’ পরিচালক সুদীপ্ত রায়ের সাথে আমি আবার এবং আবার এবং আবার কাজ করতে চাই। কেবিন গার্ডের সময় অনেক দৃশ্য ফ্লোরে গিয়ে আমরা আলোচনা করে করেছি। আমাদের ভাবনাচিন্তার মধ্যে মিল রয়েছে, তাই প্রচুর কাজ করতে চাই সুদীপ্তর সঙ্গে। আরেকজন খুব প্রিয় পরিচালক ইন্দ্রাশিষ আচার্য। ওনার দুটো ছবি আমি করেছি, ‘বিলু রাক্ষস’ ও ‘পিউপা’। আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছে এই দুটো ছবি। ওনার সাথে আমি আবার কাজ করতে চাই। পরিচালক তথাগত ব্যানার্জি আমার মেন্টর। ওনার সাথে আমি ‘ শেষ অঙ্ক ‘ বলে একটা ছবি করেছিলাম। আবার কাজ করতে চাই তথাগতদার সাথে। অরিন্দম শীলের সাথে এখনো পর্যন্ত দুটো কাজ হয়েছে, আবার কাজ করতে চাই। মৈনাক ভৌমিকের সাথেও কাজ করতে চাই। নতুন কিছু পরিচালক অভিনব চিন্তাভাবনা করছে সিনেমা নিয়ে। আমি  ‘আড্ডা ‘ বলে একটা ছবি করেছিলাম,  পরিচালক দেবায়ুষ চৌধুরী একদম নবাগত একটি ছেলে। ভীষণ ভালো কনসেপ্ট ছিল, বাঙালির আড্ডার একটা জায়গা ছিল, বৈশিষ্ট্য ছিল এই ছবিটার মধ্যে।এরকম অনেক নতুন ছেলেরা আসছে,  তাদেরকে তুলে ধরাটা খুব জরুরী।  নতুন পরিচালকদের সুযোগ না দিলে ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন ধরনের নতুন ধাঁচের ছবি হবে কি করে?  সেই তিন চারজন পরিচালকের তৈরি একই ধাঁচের ছবি তৈরি হতে থাকবে।

দেবলীনা : একদম ঠিক।  নতুন পরিচালকরা না এলে আমরা নতুন ধরনের ছবি পাব কি করে?

দেবপ্রসাদ : এইজন্যই নতুন পরিচালকদের পাশে আপনাদের মানে মিডিয়াকেও থাকতে হবে। অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রিতে দেখুন কত নতুন নতুন পরিচালক কত ভালো ভালো অভিনব কাজ করছে,  সেখানে আমরা এখনো ব্যোমকেশ-ফেলুদার বাইরে বেরোতেই পারছি না। আজকে যদি মুম্বাইতে অনুরাগ কাশ্যপ,  দিবাকর ব্যানার্জির মত পরিচালক না আসতেন তাহলে কি ওই ছবিগুলো আমরা দেখতে পেতাম?  আজও তাহলে হিন্দি ছবি মানেই সেই শাহরুখ খান কাজলের হাত ধরে সরষে ক্ষেতে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেখে যেতে হত। চারটে দেওয়ালের ভেতরে রোমান্টিসিজম, চারটে দেওয়ালের ভেতরে আঁতলামো, পুরনো প্রেম, পরকীয়া –  এর বাইরে বের হতে হবে। এগুলো আমরা দেখে ফেলেছি,  এবার নতুন কি দেখতে চাই বা দেখাতে পারি সেগুলো ভাবার সময় এসেছে। নাহলে আমরা এগোতে পারব না। এগুলো বাদ দিয়ে মানুষ আরও নানারকম ক্রাইসিসে ভুগছে,  সময় এসেছে সেই বিষয়গুলোকে গল্প হিসেবে তুলে ধরার। সেগুলো তো আমরা করছি না, আমরা করছি ব্যোমকেশ-ফেলুদা।

দেবলীনা : বাংলায় এখন অনেক ভালো অভিনেতারা কিন্তু কাজ করছে। এইসময়ে যারা নতুন কাজ করছে, তাদের মধ্যে আপনার পছন্দের অভিনেতা হিসেবে কাদের নাম বলবেন?

দেবপ্রসাদ : আমার খুব পছন্দের একজন অভিনেতা আছেন, যার নাম অমিত সাহা। এই ছেলেটি কেবিন গার্ডে খবরের কাগজের হকার চরিত্রটি করেছিল। খুব প্রতিভাবান অভিনেতা ও ভীষণ ভালো মানুষ।  কেবিন গার্ডেরই আমার সহ অভিনেতা প্রীতম খুব ভালো। নতুন আরো কয়েকজন ছেলে খুব ভালো অভিনয় করছে, এখনই সবার নাম মনে পড়ছে না। অপ্রতিম বলে একটা ছেলে আছে,  সেও খুব ভালো কাজ করছে। কিন্তু বিষয়টা কি হয়, আমাদের এখানে ইন্ডাস্ট্রিতে একটা সমস্যা আছে। আমার সাথেও এই সমস্যাটা হয়েছে। আমি যখন শুরু করেছিলাম বন্ধুর চরিত্রে,  তারপর থেকে দেখলাম আগামী দুবছর আমি শুধু বন্ধুর চরিত্রই পাচ্ছি।  অভিনেতার গায়ে একটা স্ট্যাম্প ফেলে দেওয়া হয় যে এই একটা ধরনের চরিত্রেই ইনি মানানসই। কমেডি যেহেতু আমি ভালো করতে পারি, সবাই ভাবছে আমি কমেডি ভালো পারি,  সেটা খুব ভালো কথা, কিন্তু আমাকে সেটা ছাড়া অন্য কোনো চরিত্রে ভাবা হচ্ছে না এটা খুব কষ্টের। আমি অন্যান্য নানান ধাঁচের চরিত্রতেও যে স্বচ্ছন্দ,  সেটা আমাকে ওই চরিত্রে না নেওয়া হলে বোঝাব কি করে! এটাই আমাদের ইন্ডাস্ট্রির একটা সমস্যা, অভিনেতার গায়ে স্ট্যাম্প ফেলে দেওয়া। নাহলে অনেক ভালো অভিনেতা আছে, যাদের নানান ধাঁচের অভিনয় করার ক্ষমতা আছে, কিন্তু তাদের ঠিকঠাক মূল্যায়ন আমাদের এখানে হয় না।

দেবলীনা : বাংলা ছাড়া অন্য ভাষায় কাজ করার ইচ্ছে আছে?

দেবপ্রসাদ : নিশ্চয়ই চাই। অন্য ভাষা বলতে আমি হিন্দির কথাই বলব, ওই ভাষাতে দখল আছে তাই। আমি তো সাউথ ইন্ডিয়ান বলতে পারি না, তাই সেরকম ইচ্ছে রেখে লাভ নেই (হাসি)।  হিন্দিতে কয়েকটা ছবির কথা চলছে। দুটো ছবির কথা অনেকটাই ফাইনাল হয়ে আছে। কিন্তু পুরোপুরি ফাইনাল না হলে ওগুলো নিয়ে এখনই কিছু বলতে চাইছি না।

দেবলীনা : কোনো ড্রিম চরিত্র আছে?

দেবপ্রসাদ : না ওরকম কোনো চরিত্র নেই। আমি মনে করি আমার কাছে আসা প্রত্যেকটি চরিত্রই কঠিন। প্রত্যেকটি চরিত্রই আমাকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করায়। একজন অভিনেতা প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রের সাথে একাত্ম হয়ে নিজে বাঁচে। প্রত্যেকটি চরিত্রই আমার কাছে নতুন,  তাই প্রত্যেক চরিত্র আমার কাছে স্বপ্নের চরিত্র। কারন আমি সেই চরিত্রটাকে চিনি না, অথচ সেই চরিত্রকেই  আপন করে বিশ্বাসযোগ্য ভাবে আমাকে ফুটিয়ে তুলতে হবে। তাই প্রত্যেকটি নতুন চরিত্র আমাকে নতুন নতুন আস্বাদ দেয়।

দেবলীনা : ‘কেবিন গার্ড’ এ ফিরি। এরকম ডার্ক চরিত্রে আপনাকে এর আগে কখনো দেখা যায় নি। এই চরিত্রে অভিনয়ের অনুভূতি বা অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

দেবপ্রসাদ : কেবিন গার্ডের আগে এরকম ডার্ক চরিত্রে সত্যিই আমি কাজ করিনি। তবে এরকম বিষয় ও চরিত্র আমার খুব প্রিয়। সুদীপ্ত রায়ের এর আগের ছবি ‘ কিয়া অ্যান্ড কসমস’ খুব ভালো মিষ্টি একটা ছবি ছিল।  সুদীপ্ত যখন প্রথম এই গল্পটা আমাকে শোনায়, আমার মনে আছে সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। গল্পটা শুনেই আমি বুঝেছিলাম এই চিন্ময় পালিতকে লোকে খুব ঘেন্না করবে। কেবিন গার্ড যদি তুমি দেখো দেখবে কোথাও গিয়ে চিন্ময় নিজে খুব একা এবং দর্শক তাকে প্রচন্ড ঘৃণা করছে। এই একাকীত্বটাকে আমি উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছিলাম। পরিচালক আর আমি সবসময় আলোচনা করে যুক্তি বিচার করে প্রত্যেকটা দৃশ্য করেছি। কাঁধে ব্যথার যে ব্যাপারটা আমরা অনেক কেবিন গার্ডদের সাথে কথা বলেছি ওই ব্যাপারে। তাঁরা তো রোজ ওই রড টা টানেন, তাতে কি ধরনের ব্যথা হয়,  আঘাত লাগলে কিরকম হয় সেগুলো বোঝার চেষ্টা করেছি। এই চরিত্রটার সাথে সত্যিই সেসময় মিশে গেছিলাম।পরে একটা পার্টিতে কস্টিউমের একজন আমাকে বলেছিল, দেবুদা ফ্লোরে তোমার সাথে কথা বলতে আমাদের ভয় লাগত। আমার শুনে ভালোই লেগেছিল। আসলে এই ধরনের চরিত্র করার মজা এটাই। ১৩ দিন আমরা একসাথে শ্যুটিং করেছি, তারপরও আমার সাথে কথা বলতে ভয় লাগার কারণ এটাই যে চিন্ময় পালিত আমাকে ঢেকে ফেলেছিল। এইরকম অভিনয়ের সুযোগ সত্যিই তৃপ্তি দেয়।

দেবলীনা : বাইরের লোকে তো আপনাকে দেখে ভয় পাচ্ছে, কিন্তু আপনি নিজে যখন ওই চরিত্রটা থেকে বের হচ্ছেন, কোনোরকম হ্যাংওভার হয়েছে কি?

দেবপ্রসাদ : প্রচন্ড কষ্টদায়ক প্রচন্ড হ্যাংওভার হয়। এই ধরনের চরিত্রই হ্যাংওভারটা দেয়। পার্সোনাল লাইফে অনেকরকম সমস্যা হয় এই ধরনের চরিত্র থেকে বের হওয়ার পর। চিন্ময় পালিতের চরিত্র থেকে বের হয়ে আমি তো বাড়ি ফিরে এলাম। কিন্তু চিন্ময় তখনো আমার সাথেই থেকে গেছে। তার হিংসা,  ঘৃণা, অন্যের ক্ষতি করার চেষ্টা সবকিছুই থেকে যায়। যন্ত্রের মত চিন্ময় থেকে দেবপ্রসাদে পরিবর্তন সম্ভব না। কিছুটা সময় লাগে। কেউই তাঁর কাছে প্রিয় নয়, সে সবাইকে মারতে চায়। এমন মানুষকে মাথায় বহন করে আমি যখন বাড়িতে প্রিয় মানুষদের কাছে যাই ঠিকঠাক কথা বলতে পারি না,  মাথা ধরে যায়। এগুলো হবেই কিছু করার নেই।

দেবলীনা : অভিনয় ছাড়া ক্যামেরার পেছনে কাজ করার ইচ্ছে আছে?

দেবপ্রসাদ : আপাতত না। এখনো অনেক শেখার বাকি আছে। আর আমার এমন কোনো তাড়া নেই যে আমাকে পরিচালক হতেই হবে। বলা হয় যে ক্যামেরার পেছনে পরিচালকই ক্যাপ্টেন অফ দ্য শিপ। তা ক্যাপ্টেন হতে হলে তাকে তো অনেককিছু জানতে হবে। সবকিছু না জেনেই আমি পরিচালকের আসনে বসতে পারব না। যদিও অনেকেই কিছু না জেনে পরিচালক হয়ে যান।  সেটা তাদের সাথে কথা বললেই বুঝতে পারা যায়। অনেক পরিচালক গল্প বলতে এসে শট দিয়ে শুরু করেন। আরে গল্পটা তো গল্পের মতই বলতে হবে। এরকম কথা বলেই বোঝা যায় যে পরিচালক কেমন। আমার বক্তব্য পরিচালক হতে হলে সম্পূর্ণ জ্ঞান অর্জন না করে আসা উচিত না। আমি অভিনয়ের ক্ষেত্রেও তাই করেছি। যতক্ষণ না বেসিক জ্ঞান টুকু অর্জন করছি তার আগে পা বাড়াই নি।

দেবলীনা : অভিনয় কি আপনি শিখেছেন?

দেবপ্রসাদ : পুরোটাই নিজে শেখা, দেখে শেখা। কোনো ইন্সটিটিউশন থেকে শিখি নি। কোনোদিন থিয়েটার করিনি এমনকি স্টেজেও উঠিনি।

দেবলীনা : অভিনয় করব এমনটা মনে হল কি করে?

দেবপ্রসাদ : আমার কোনোদিনই মনে হয়নি আমি অভিনয় করব। আমার ক্যামেরার পেছনের কাজ খুব ভালো লাগত। আমার চেনা একজন দাদার মত পরিচালক যাঁর নাম তথাগত ব্যানার্জী,  ওনার কথা আগেও বললাম।  ‘শেষ অঙ্ক’ যাঁর সাথে করেছি। তখন তথাদার স্টার জলসায় ‘কুহেলী’ বলে একটা কাজ চলছিল, যার পোস্ট প্রোডাকশনের কাজ আমি করছিলাম। ওখানেই তথাদা আমাকে একদিন বলেন, তুই ক্যামেরার সামনে আয়। ক্যামেরার পেছনে ফালতু সময় নষ্ট করছিস। তারপর ধীরে ধীরে টেকনিক্যাল বিষয়গুলোর সাথে অভিনয়টাও শেখা হাতেকলমে। ছোট ছোট চরিত্রে ক্যামেরার সামনে আসতে শুরু করলাম ও শেখার শুরু হল।প্রথমদিকে লেন্স সম্বন্ধে কিছুই বুঝতাম না। তথাদা আমাকে অনেককিছু শিখিয়েছে। নিজের জীবনবোধ শিখিয়েছে,  অভিনেতা হতে গেলে জীবনবোধ থাকাটা খুব দরকার। এভাবেই ধীরে ধীরে অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসাটা নেশার মত হয়ে গেল। যতদিন এই নেশাটা থাকবে আমার শেখার ইচ্ছেটাও থেকে যাবে।

দেবলীনা : অভিনয়ে নতুন যারা প্রবেশ করতে চায় তাদের জন্য বিশেষ কিছু পরামর্শ 

দেবপ্রসাদ : বিশেষ কিছুই নয়,  সবচেয়ে প্রয়োজনীয় যেটা সেটা হল আগে নিজেকে তৈরি করা। আর সাথে চাই ধৈর্য।  অনেকেই নতুন আসছে অভিনয়ে, তাদের লক্ষ্যটা স্থির নেই। লক্ষ্যটা তাদের অন্য জিনিসের প্রতি কিন্তু তারা আসছে  অভিনয়ে। কবে আমাকে রাস্তায় দশটা লোক চিনবে আর কবে আমি একটা গাড়ি কিনব! লক্ষ্য যদি এই দুটো হয় তাহলে আমি খুব তাড়াতাড়ি গিয়ে সিরিয়াল করতে শুরু করব। কিন্তু শর্টকাটে কিছু পেয়ে গেলে সেটা ক্ষণস্থায়ী হয় বলে আমার বিশ্বাস। বড় অভিনেতা হলে সাফল্য এমনিই আসবে, সাফল্যের পেছনে দৌড়াতে হবে না। সেজন্যে প্র‍্যাকটিস ও ধৈর্যের খুব প্রয়োজন।  আর আমি বিশ্বাস করি সুযোগ সবার জীবনেই একবার না একবার আসে। কেউ সেই সুযোগ কাজে লাগায়, কেউ সুযোগ হারায়। সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য কি করা উচিত সেটাতে আগে মন দেওয়া দরকার। নতুনদের উদ্দেশ্যে তাই বলছি লক্ষ্য স্থির রেখে ধৈর্যের সাথে সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here