শুধুমাত্র সফলতা নয়, নিজের কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়াটাই লক্ষ্য : রাজদীপ

0
53

 

তে পারতেন ডিজে অথবা পেইন্টার কিন্তু হলেন অভিনেতা। শুরুতেই স্টার জলসার ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ তে ঈশান হিসেবে তুমুল জনপ্রিয়তা, তারপর ছোটপর্দার এই সেলেব বিগত দুবছর ধরে হইচই ওয়েব প্ল্যাটফর্মে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। নিউ জেনারেশন এখন রাজদীপের চরম ভক্ত। স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়ের সাথে হাসিখুশি ইমেজ তাঁর জনপ্রিয়তার চাবিকাঠি। হাতের লর্ড শিবা আর ট্রাইব চিহ্নের ট্যাটু জেন নেক্সটের কাছে রীতিমতো ট্রেন্ড। পর্দার চরিত্রের থেকে বাস্তবে কতটা আলাদা রাজদীপ গুপ্ত, কথোপকথনে জানার চেষ্টা করলেন আমাদের প্রতিনিধি দেবলীনা ব্যানার্জী।

দেবলীনা : অভিনয়ের শুরু কিভাবে?

রাজদীপ : অভিনয়ের শুরু দশ বছর আগে,  ২০০৯ সালে। তখন একদম অন্যরকম পেশায় ছিলাম। আমি ডিজে ছিলাম। আমার কিছু বন্ধু অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তার মধ্যে পার্নো (মিত্র) প্রথম রবিস্যারের সাথে একটা ইভেন্টে আমার আলাপ করিয়ে দেয়। অভিনয় নিয়ে তখনো তেমন কিছু ভাবনাচিন্তা ছিল না। বাংলা টেলি সিরিয়াল কোনোদিন দেখিই নি তার আগে। এরপর আর এক বন্ধু অনিন্দিতা যখন ‘বউ কথা কও’ করছিল তখন ওর মাধ্যমে মন্দিরা দির সাথে পরিচয় হয়। মন্দিরা দি তখন রবি ওঝা প্রোডাকশনের ক্রিয়েটিভ হেড ছিল।ওখানেই রবি স্যারের সাথে দেখা করি ও ওনার কথামত একটা ওয়ার্কশপ করি। এরপর রবি ওঝা প্রোডাকশনের ‘ওগো বধূ সুন্দরী ‘ তে ঈশানের চরিত্রে আমার অভিনয় জীবনের শুরু। দেখতে দেখতে  দশ বছর হয়ে গেল আমার অভিনয় জীবনের।

দেবলীনা : তুমি ডিজে,  পেইন্টার, অভিনেতা – এগুলোর মধ্যে কোনটা কেরিয়ার আর কোনটা শখ?

রাজদীপ : পেইন্টিং সম্পূর্ণ আমার মুডের ওপর নির্ভর করে। যখন খালি থাকি বা বোর হচ্ছি তখন পেইন্টিং করি। অভিনয় এখন আমার সবকিছু।  অভিনয় ছাড়া আমি থাকতেই পারব না। আর ডিজে টা হল একটা প্যাশনের জায়গা। এখনও যখন ক্লাবে যাই দেখি বন্ধুরা বাজাচ্ছে, পুরোনো শখ জেগে ওঠে। আমিও তখন হয়ত দশ পনেরো মিনিট বাজিয়ে নিলাম।

দেবলীনা : টেলিভিশন,  সিনেমা না ওয়েব কোন মাধ্যমে তুমি বেশি স্বচ্ছন্দ?

রাজদীপ : গত দুবছর ধরে টেলিভিশন থেকে ব্রেক নিয়ে শুধু ওয়েবই করছি। শুরুটা আমার টেলিভিশনে, সেখান থেকেই নাম পরিচিতি সব পেয়েছি। টেলিভিশন থেকে অনেক শিখেছি।  রোজ যেহেতু অনেক সময় ধরে কাজ করতে হয় তাই আমার মনে হয় টেলিভিশনটা অনেকটা ওয়ার্কশপের মত। সিনেমা টা এখনও সেভাবে ক্লিক করে নি। জানি না কেনো। হতে পারে আমার আরো প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে। তবে ওয়েব টা গত তিনবছর ধরে করছি। ওয়েবে অভিনয় আমি সত্যিই খুব উপভোগ করি। অনেক স্বাধীনতা আছে ওয়েবে।টেলিভিশনের যেমন অনেক বাঁধাধরা ব্যাপার থাকে, প্যাটার্ন থাকে, সেন্সর থাকে ওয়েব সেসব থেকে মুক্ত। তাই ওয়েব টাকে আমার খুব ন্যাচারাল মনে হয়। আমরা বাস্তব জীবনে যেভাবে কথাবার্তা বলি ওয়েবে সেভাবেই অভিনয় করি। যেটা টেলিভিশনে সম্ভব হয় না।

দেবলীনা : এখন তো লোকে ওয়েবটাই বেশি দেখে। তবে অনেকের মতে ওয়েবে যেহেতু সেন্সর নেই তাই যৌনতার ছড়াছড়ি।  তোমার ‘ জাপানি টয় ‘ বা ‘মিসম্যাচ ‘ সম্বন্ধে সেরকমই শোনা যায়

রাজদীপ : আমার ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে ‘ মিসম্যাচ ‘ এর জন্য লোকে ‘ জাপানি টয় ‘ সম্বন্ধে এরকম বলে। কিন্তু ‘ জাপানি টয় ‘ যারা দেখেছে তারা এরকম ভাবে না। ‘ জাপানি টয় ‘ শুধুমাত্র সেক্স কমেডি নয়, ওটা আসলে পলিটিক্যাল স্যাটায়ার। বিষয়টা ছিল সেক্স নিয়ে কথা,  কিন্তু সেখানে কোনো ঘনিষ্ঠ দৃশ্য ছিল না। আর প্রত্যেকটা জিনিসেরই একটা ভালো দিক আর একটা খারাপ দিক থাকে। অনেক ক্ষেত্রে হয়ত এমনটা হয়েছে যে সেন্সর নেই বলে অবাধ যৌনতাকে ঢোকানো হয়েছে। কিন্তু সবক্ষেত্রেই এমন হয় এটা মানা যাবে না। আমরা ইংরেজি বা হিন্দি ছবিতেও কিন্তু অনেক ঘনিষ্ঠ দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত। ওয়েবে অনেক ভালো গল্প, ভালো মানের কাজ হয়েছে। কিন্তু ওই যে একটা ট্যাগ পড়ে গেছে সেন্সর নেই বলে অবাধ যৌনতা। এটা একটা চিন্তাধারায় পরিনত হয়েছে।

দেবলীনা : আমি নিজেও ‘ জাপানি টয় ‘ দেখেছি। সত্যিই কোনো ভালগার দৃশ্য নেই। কিন্তু কি হয়, ওই শব্দগুলো যা বারবার ব্যবহৃত হয়েছে, ওগুলো কানে এলে হয়ত অনেকের একটা অস্বস্তি হয়।

রাজদীপ : দ্যাখো আমরা বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে যখন নিজেরা কথা বলি চারটে গালাগাল সবসময়ই দেই। বাবা মায়ের সামনে হয়ত ওগুলো উচ্চারণ করি না। কিন্তু নিজেদের মধ্যে সবসময়ই এসব চলে।  জাপানি টয়ের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে লোকে এগুলোর আকর্ষণে সিরিজ টা দেখেছে এবং তারপর বুঝেছে যে এর মধ্যে একটা মেসেজ আছে।

দেবলীনা : জাপানি টয়ের নায়ক জয় নিজের ব্যবসা সম্পর্কে পরিবারকে অন্ধকারে রাখে। তুমি নিজে এই ‘জাপানি টয়’ বা ‘মিসম্যাচ’ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছিলে? তারা দেখেছে?

রাজদীপ : আমার সামনে দেখে নি। তবে এখন যেহেতু সোশ্যাল মিডিয়া সকলের হাতের মুঠোয় তাই কোনোকিছুই লুকোনো থাকে না। অনেক সময় বাবা মাকে অনেকে ভিডিও ক্লিপিংস পাঠায়। আমি জানি আমার সামনে না দেখলেও ওরা দেখেছে। ওরা জাপানি টয় বা মিসম্যাচের কথা তুললে কোনো উত্তর না দিয়ে চুপচাপ শুনে যাই। আমার বাবা মার ছেলের ওপর যথেষ্ট বিশ্বাস আছে। ওরা জানে আমি কখনো লিমিট ক্রস করব না। আমার কাজ নিয়েও ওরা খুব গর্বিত।

দেবলীনা : এখনো পর্যন্ত করা চরিত্রদের মধ্যে কার সঙ্গে নিজের মিল খুঁজে পাও?

রাজদীপ : এরকমভাবে বলা মুশকিল। আমি যে কটা চরিত্র করেছি তাদের প্রত্যেকের মধ্যে কিছু না কিছু ক্ষেত্রে আমার নিজের ঝলক তো অবশ্যই আছে। রাগ, ইমোশন,  মজার দৃশ্যে নিজের আবেগ অনুভূতি মিশেই যায়। আমি একজন স্করপিয়ন,  তাই আমি মনে করি মাল্টিপল পার্সোনালিটি আমার একটা দিকও বটে। যা এই চরিত্রদের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। যেমন জয়ের ভোকাল চরিত্রের সাথে আমার অনেকটাই মিল আছে।

দেবলীনা : ড্রিম চরিত্র কিছু আছে?

রাজদীপ : আমি মাল্টিপল পার্সোনালিটির  চরিত্রে অভিনয় করতে চাই। স্পিড বলে একটা ছবি দেখেছিলাম,  যেখানে অভিনেতা বারোটা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। মেন্টাল ডিসঅর্ডার ও ডুয়েল পার্সোনালিটির চরিত্র আমরা দেখেছি। সেরকম মাল্টিপল পার্সোনালিটি চরিত্র যাতে অনেক শেডস থাকবে এরকম একটা ইচ্ছে আছে। একসাথে অনেকগুলো চরিত্র করা একটা বেশ চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার হবে।

দেবলীনা : সামনে কি কি প্রজেক্ট আসছে ?

রাজদীপ : এই মূহুর্তে অনেকগুলো প্রজেক্ট আটকে আছে। ফাইনাল না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা ঠিক হবে না।

দেবলীনা : এসভিএফ ছাড়া বাইরে কাজ করছ?

রাজদীপ : গত বছরই সুরিন্দর ফিল্মস এর সাথে হরদার পরিচালনায় বুম্বাদার সাথে একটা ছবি করলাম। ওয়েবের ক্ষেত্রে যেহেতু হইচই এর সাথে কন্ট্রাক্ট ছিল তাই মনে হচ্ছে এসভিএফ এর বাইরে কাজ করিনি। আগেও করেছি, ভবিষ্যতেও অবশ্যই করব।

দেবলীনা : টেলিভিশনের উল্লেখযোগ্য কাজ কি কি?

রাজদীপ : প্রথম কাজ ‘ওগো বধূ সুন্দরী’ র নাম অবশ্যই নেব। এরপরের কাজগুলো অনেকটা গ্যাপে করেছি। কালার্স বাংলায় ‘ আপনজন’, জলসাতে ‘ঝাঁঝ লবঙ্গ ফুল’, স্নেহাশিস দার ‘বাক্সবদল’।

দেবলীনা : দশ বছর পরে নিজেকে কোথায় দেখতে চাও?

রাজদীপ : অভিনয়ে দশ বছর পার করে এসে এখন আমি খুশি। আগামী দশ বছরে কোথায় পৌঁছাতে পারব এখনই কি করে বলি! তবে এটুকু বলতে পারি সফল অভিনেতা হই বা না হই,  নিজের কাজে সন্তুষ্ট একজন অভিনেতা যেন হতে পারি।

দেবলীনা : স্ট্রাগলিং পিরিয়ড কেমন ছিল?

রাজদীপ : স্ট্রাগল শুধু শুরুতে নয়, এরকম অনিশ্চিত প্রফেশনে সবসময়ই চলতে থাকে। যেমন আগস্ট থেকে আমি তেমন কোনো কাজ করিনি, তাই এখন স্ট্রাগলিং পিরিয়ড চলছে বলাই যেতে পারে। ২০১৮ টা আমার খুব ভালো কেটেছিল। উনিশে কেবল তিনটে কাজ করেছি।

দেবলীনা : যারা তোমার ভক্ত বা যারা মনে করে আমিও রাজদীপ হতে চাই,  তাদের জন্য কিছু বলতে চাও?

রাজদীপ : এখন তো নতুন যারা অভিনয়ে আসছে প্রত্যেকেই খুব ভালো অভিনয় করে। তবে আমি মনে করি শুরুতেই একটা ওয়ার্কশপ করা উচিত। আমিও রবি স্যারকে পেয়েছিলাম বলে অনেক কিছু শিখেছি। টেলিভিশনে অনেকে হঠাৎ সুযোগ পেয়ে যায়, কিন্তু  হারিয়ে যেতেও সময় লাগে না। টিকে থাকতে হলে বেসিক শিক্ষাটা প্রয়োজন।  আমি এখনও সময় পেলে ওয়ার্কশপে যোগ দিই। কলকাতায় এখন অনেক ভালো অভিনয় শেখার স্কুলও আছে। তাই এই জগতে প্রবেশ করতে হলে শিক্ষাটা খুব দরকার বলে মনে করি।

দেবলীনা : মুম্বাইয়ে কিছুদিন থেকে ফিরে এলে কেনো?

রাজদীপ : দুহাজার তেরোর হাফ থেকে চোদ্দ পর্যন্ত দেড়বছর মুম্বাইয়ে ছিলাম।  কিন্তু কোনো কন্ট্রাক্টের জন্য ছিলাম না। বিজ্ঞাপনের কাজ আর ইউ টিভি সিরিজ করছিলাম। এর মাঝে কিছুদিনের জন্য কলকাতায় ঘুরতে এসেছিলাম। এখানে তখন কাজগুলো আসা শুরু হল। তাই কাজ ছেড়ে আর মুম্বাই গেলাম না।

দেবলীনা : বাড়িতে কে কে আছে?

রাজদীপ : বাবা, মা, ভাই,  বৌদি

দেবলীনা : বিশেষ বান্ধবী কেউ আছে?

রাজদীপ : গত সাড়ে তিনবছর ধরে কেউ নেই। শেষ সম্পর্কটার পরে আর কোনো সিরিয়াস সম্পর্কে যাওয়া হয় নি। এখন এসব নিয়ে ভাবছি না। সামনের বছরে কিছু ভালো কাজ করতে চাই। আগে অভিনেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করি, তারপর ব্যক্তিগত সম্পর্কের ব্যাপারে ভাবনাচিন্তা করব।

দেবলীনা : কাজের জগতে কাছের বন্ধু কারা?

রাজদীপ : জাপানি টয়ের পর থেকে সৌরভের সাথে বন্ডিং খুব জোরালো হয়েছে। পরিচালক হিসেবে সৌরভ আমার খুব পছন্দের ও সাথে খুব ভালো একজন বন্ধু।  সৌমিক চট্টোপাধ্যায়ের সাথে তিনটে কাজ করা হয়ে গেছে। দাদার সাথে আমার টিউনিংটা খুব ভালো। এরপর বাবাইদা মানে ডিওপি প্রতীক মুখার্জির নাম বলব। আবীরা মজুমদার আমার দিদির মত,  একেবারে বাড়ির সদস্য হয়ে গেছে। সাহেবের সাথে ডামাডোল করার সময় থেকে গভীর বন্ধুত্ব। দেবপ্রিয়র সাথে বন্ধুত্ব শুধু কাজের সূত্রে না, ও আমার কাজিন, তাই পরিবারের অংশ। এছাড়া ইশা, অনিন্দ্য, ইন্দ্রাশিষ এরা আমার খুব কাছের বন্ধু।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here