আজও অমাবস্যার কালো রাত বিনম্র চিত্তে স্মরন করে বুড়িমাকে, কিন্তু কে এই বুড়িমা ?

0
845
কৌশিক চট্টোপাধ্যায় : বুড়িমার কথা মনে আছে আপনার? মনে নেই? আরে সেই বুড়িমার কথা বলছি! শরত আকাশে পেঁজা তুলোর মতো মেঘের আনাগোনা শুরু হলেই নিজের অস্তিত্ব জানান দিতো যে ‘বুড়িমা’ । ভারত পাক ক্রিকেট ম্যাচ থেকে শুরু করে মোহনবাগান- ইস্টবেঙ্গল, একসাথে গোটা দার্জিলিং থেকে সুন্দরবন গর্জে উঠতো যে বুড়িমার তালে তাল মিলিয়ে। বিয়ের শোভাযাত্রা হোক বা নতুন বছরকে স্বাগত জানানো অথবা ধরুন নির্বাচনে বিজয়ী দলের উন্মাদনায় আগাগোড়াই এবাংলার বুকে একসময় দাপিয়ে বেড়িয়েছেন বুড়িমা। এবারে চিনতে পারলেন তো?  বুড়িমার চকলেট বোম । একসময়ে কালীপুজার গাঢ় অন্ধকারে বাংলার শহরে গ্রামে সশব্দে গর্জে উঠতো বুড়িমার বানানো চকলেট বোম।  কিন্তু আজ পুরোটাই যেন অতীত। ১৯৯৬- ৯৭ সালের পরথেকে শব্দবাজি নিয়ে প্রশাসনিক কঠোরতার জেরে বুড়িমার আওয়াজ কিছুটা থমকে গেলেও পরবর্তীতে আলোকবাজির বাজার সহজেই ধরে ফেলেছেন ‘ব্রান্ড বুড়িমা’ । কিন্তু কে এই বুড়িমা?  আসুন একটু নজর দেই ব্রান্ড বুড়িমার রূপকথার ইতিহাসে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানাগেছে, বুড়িমার আসলে নাম অন্নপূর্ণা দাস। জন্ম অবিভক্ত বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলায় । স্বামী সুরেন্দ্র নাথের মৃত্যুর পর  দেশ ভাগের সময় ভিটেমাটি ছেড়ে তিন মেয়ে এক ছেলেকে নিয়ে অবিভক্ত পশ্চিম দিনাজপুরের সরকারি ক্যাম্পে আসেন অসহায় অন্নপূর্ণা। পূর্ব পাকিস্তানের সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে হয়ে উদ্বাস্তুদের ক্যাম্পের অসহায় অবস্থা তাকে জীবন যুদ্ধে লড়াইয়ের শক্তি যুগিয়েছিল।এ দেশে আসার পর একদিকে অর্থাভাব অন্যদিকে ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যৎ দিশেহারা করে তুলছিলো মা অন্নপূর্ণাকে।জানাগেছে ক্যাম্প থেকে বর্তমান দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুরে চলে যান তিনি। সেখানে গিয়ে প্রথমে কিছুদিন বিড়ি বাঁধার কাজে যুক্ত হন। ধিরে ধিরে বিড়ির ব্যবসা শুরু করেন তিনি। এরপরে যেন স্বপ্নের মতো উত্থান হতে থাকে এই অসহায় অন্নপূর্ণার জীবনে। গঙ্গারাপুরে গড়ে তোলেন নিজের প্রথম বিড়ি কারখানা। কিন্তু কিছু দিন বাদে হাওড়ায় মেয়ের বিয়ে দেওয়ার কারনে নিজেও গঙ্গারাপুর থেকে চলে আসেন হাওড়ার বেলুড়ে। সেখানে প্যরিমোহন মুখার্জী স্ট্রিটে দোকান সহ বাড়ি কেনেন। বিড়ির পাশাপাশি বিশ্বকর্মা পুজোর ঘুড়ি, লাটাই, দোলের রঙের পাশাপাশি ছোট খাটো বাজী  বিক্রি শুরু করেন। জীবন যুদ্ধে মাথাতুলে বাঁচতে চাওয়া অন্নপূর্ণার বয়স তখন প্রায় ষাট ছুঁইছুঁই। পাড়ায় ছোট ছেলেমেয়েদের কাছে অন্নপূর্ণা ক্রমেই হয়ে উঠলেন আদরের বুড়িমা। ধীরেধীরে এলাকার সবাই অন্নপূর্ণা বুড়িমা হিসেবেই পরিচিত হয়ে উঠলেন।বাজী বিক্রির পাশাপাশি বাজী নিজেই তৈরি করতে পারলে ব্যবসায় অনেক লাভ করা যাবে। সরকারি নিয়ম মেনে তৈরি করলেন বাজী কারখানা। বিভিন্ন জায়গা থেকে কারিগরদের কাজে লাগিয়ে দেন।
আর নিজের নতুন নামেই বাজারে আত্মপ্রকাশ করে তার নিজের শব্দবাজীর ব্রান্ড ‘ বুড়িমা’। ছেলে সুধীর নাথও যুক্ত হন মায়ের সাথে। বাজীর আকাশে  উড়তে থাকে বুড়িমার রকেট। কিন্তু সবচেয়ে জনপ্রিয় হয় বুড়িমার চকলেট বোম।  তামিলনাড়ুর শিবকাশী এলাকায় দেশলাইয়ের কারখানা তৈরি করেন তিনি। ১৯৯৫ এ বুড়িমার মৃত্যুর পর  ধিরে ধিরে তার পরবর্তী প্রজন্ম অর্থাৎ নাতিরা ব্যবসায় যুক্ত হয়। যদিও পরে বছর থেকেই শব্দ বাজি হিসেবে চকলেট বোমকে কিছু ক্ষেত্রে  নিয়ন্ত্রণ  করার পথে হাঁটতে শুরু করে  সরকার। ধিরে ধিরে পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়ে যায় চকলেট বোম জাতীয় শব্দবাজী গুলি। কিন্তু বুড়িমার চকলেট বোমের স্মৃতি আজো দগদগে সাধারণ মানুষের মনে। তাই আজো প্রতিবছর একজন সাধারণ ঘরোয়া মহিলার জীবন যুদ্ধে হার না মানা জীবনের রূপকথা আলোর ফুলঝুরি হয়ে রঙিন করেদেয় অমাবস্যার রাতের আকাশকে ।