মুভি রিভিউ : ‘গুমনামী’ তিনিই নেতাজী অথবা গুমনামী অথবা পুরোটাই ছলনা! টানটান রহস্যের বাতাবরণে সৃজিতের ‘গুমনামী’ বাস্তবিকই মাস্টারপিস

0
685
পরিচালনা : সৃজিত মুখোপাধ্যায় 
অভিনয় : প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়,  অনির্বাণ ভট্টাচার্য,  তনুশ্রী চক্রবর্তী 
রেটিং : ৪/৫
দেবলীনা ব্যানার্জী : ভারতবাসীর কাছে এযাবৎ সবচেয়ে বড় রহস্য, যার কোনো কিনারা আজ অবধি কোনো সত্যান্বেষী করতে পারে নি। যে রহস্য যেকোনো ভারতীয় তথা বাঙালিকে আজও ভাবতে বাধ্য করে। সত্যিই কি তিনি তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেছিলেন! নাকি তাঁর মত ব্যক্তিত্ব শেষ মূহুর্তে সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে অন্য কোথাও চলে গেছিলেন!
অথবা পুরোটাই ছিল সাজানো ছক, কূটনৈতিক ছলনা! এতদিন বাদেও এ প্রশ্নগুলো যদি আমাদের মনকে বিচলিত করে তাহলে ভাবুন সেসময় যখন প্রিয় দেশনেতার আকষ্মিক মৃত্যুর খবর কেউই মেনে নিতে পারছিলেন না, তার সাথে হঠাৎই খোঁজ পাওয়া গেল এক সাধুবাবার, যার গলার স্বর,  কথাবার্তা সবেতেই নেতাজীর ঝলক। স্বাভাবিক ভাবেই তুমুল চাঞ্চল্য ছড়াল সর্বত্র।
বিষয়ের বিতর্ক পরিচালক সৃজিতের পিছু ছাড়েনি। তাই ছবি মুক্তির আগেই বারবার ছবিটিকে ঘিরে বাদানুবাদ সামনে এসেছে, গড়িয়েছে মামলা মোকদ্দমা অবধি। কিন্তু ছবিটি একবার দেখলেই বিতর্কের অবসান ঘটত। গুমনামী ঘিরে যে রহস্য তার কোনো সমাধান করতে তো চাননি পরিচালক,  পুরো ছবিটি ঘিরে রহস্যের বাতাবরণটাকে কাটানোর চেষ্টাও দেখা যায় না।
যেখানে দর্শককে রহস্য সমাধানের কাজে লাগিয়ে দেন পরিচালক, যে যার মত করে এবার রহস্যের সমাধান করুন। এখানেই সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের মত পরিচালক আলাদা। এই ট্রিটমেন্ট এই মূহুর্তে অন্য কেউ দিতে পারতেন না একথা হলফ করে বলতে পারি। তাই ‘গুমনামী’ সবার আগে সৃজিতের ছবি, তাঁর ঘরানার ছবি। ‘গুমনামী’ র সাথেই ‘সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ ‘ ও ‘ মিতিন মাসি’ র মত গোয়েন্দা গল্প মুক্তি পেয়েছে। তবু রহস্যের বিচারে এই দুই ছবিকে অনেকটাই পেছনে ফেলে দেবে ‘ গুমনামী ‘।
গল্পের শুরু ১৯৯৯ এ সাংবাদিক চন্দ্রচূড়ের হাত ধরে। কোনো খেলো আবেগে ভেসে যাওয়া মানুষ চন্দ্রচূড় নয়, নেতাজী রহস্যের সমাধানে তার সাথেই গল্পে প্রবেশ করে দর্শক। নেতাজী অন্তর্ধানের রহস্যের কিনারা করতে গিয়ে বারবার ফিরে আসে অতীত সাদাকালো রঙ ধরে। আর সাথে এক প্রবল প্রতাপ মহাপুরুষ,  যাবতীয় অসম্ভবকে নস্যাৎ করে এগিয়ে চলেছেন দৃঢ় পায়ে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার লক্ষ্যে।
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের নিরিখে কখনো কখনো চন্দ্রচূড়ের মতই একরোখা, জেদী। শুধু গুমনামী বাবা নয়, গল্পের শেষে এমন ভ্রমও জেগে ওঠে সত্যিই কি নেতাজীর পুনরাবির্ভাব ঘটেছে জন্মান্তরে চন্দ্রচূড়ের হাত ধরে!  গলার স্বর বা চেহারার মিল নয়, চিন্তা মননের মিল একাত্ব করে দুই কালের দুই অসম্ভব জেদী পুরুষকে। চন্দ্রচূড়ের চোখে নেতাজীর চশমা কি তারই ইঙ্গিতবহ! রহস্য রহস্য আর রহস্য।
শুরুতে দেখা যায় নেহেরুর উপিস্থিতিতে মহাত্মা গান্ধীর সাথে দেখা করতে গেছেন সুভাষচন্দ্র বসু।কিন্তু গান্ধীজির অহিংস নীতিতে বিশ্বাসী না হয়ে দল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।কোনো আপস না করে নিজের মতবাদে বিশ্বাসী এক পুরুষের দৃঢ় পদক্ষেপে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথের সঙ্গী হয় দর্শক। কখনও মিত্র শক্তির সঙ্গে বৈঠক, আজাদ হিন্দ ফৌজ। ১৯৪৫ এর ১৮ ই আগস্ট  তাইহোকু বিমান দুর্ঘটনায় সত্যিই কি নেতাজি সুভাষ  মারা গেলেন?
নেতাজির মৃত্যু বা অন্তর্ধান নিয়ে যে রহস্য পুঞ্জীভূত হয়েছিল, তার সমাধানে বিভিন্ন সময়েগঠন করা হয়েছিল তিনটি কমিশন।এই তিনটি কমিশনের তথ্য এ ছবিতে ঘুরেফিরে এসেছে বারে বারে। ১৯৫৬ সালে গঠিত হয় শাহনওয়াজ কমিটি, যার নেতৃত্বে ছিলেন নেতাজীর এককালের সহযোদ্ধা তথা তৎকালীন সাংসদ শাহনওয়াজ খান। এই কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছিল, বিমান দুর্ঘটনাতেই মৃত্যু হয় সুভাষচন্দ্রের। কিন্তু সুভাষ বোস বেঁচে আছেন, এই গুজবের জেরে ১৯৭০ সালে ফের কমিশন গঠন করে কেন্দ্রীয় সরকার, নেতৃত্বে পঞ্জাব হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি জি ডি খোসলা, যিনি চন্দ্রচূড়ের মতে পক্ষপাতদুষ্ট, কারণ তিনি দীর্ঘদিনের “নেতাজী-বিরোধী”। এই কমিশনও বিমান দুর্ঘটনার তত্ত্বকেই সমর্থন করে।
এর পরেও ১৯৯৯ সালে ফের সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মনোজকুমার মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃতীয় একটি কমিশন গঠন করে ভারত সরকার। এই কমিশনের সামনে তথ্য পেশ করতে উপস্থিত হন চন্দ্রচূড় এবং তাঁর ‘মিশন নেতাজী’ সংগঠনের সদস্যরা।নেতাজীর মৃত্যু সংবাদ জানাতে দেরি, মৃত্যু পরবর্তী শেষ কাজের কোনও ছবি নেই, সবই চন্দ্রচূড়ের অনুসন্ধানের সূত্র ধরে সামনে আসে। নেতাজী কি আসলে রাশিয়ায় পালিয়ে গেছিলেন,  ফৈজাবাদে দেখা পাওয়া ভগবানজী আসলে কে, নেতাজীর মৃত্যুসংবাদ কি আসলে কোনো কূটনৈতিক চাল? রহস্য ও উত্তেজনায় শিরদাঁড়া টানটান হয় দর্শকের।পর্দার আড়াল থেকে যে গুমনামীবাবা  কথা বলেন সুভাষচন্দ্রের কাছের মানুষজনদের সঙ্গে, তিনিই কি আসলে নেতাজী?  প্রশ্ন থেকেই যায়।বলাবাহুল্য উত্তর দেবার কোনো চেষ্টাও করেননি পরিচালক।
সবশেষে বলি ইতিহাস নয়, ইতিহাসের ছায়ায় ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়েই এ ছবির গল্প এগিয়েছে। সৃজিতের মত পরিচালকের অসম্ভব যত্ন ও গবেষণার ফসল ‘গুমনামী’। প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় নেতাজী ও গুমনামীবাবার চরিত্রে অসম্ভব ভালো, নিজেকে কিভাবে ভাঙছেন গড়ছেন ভেবেও অবাক হতে হয়। তবে এ ছবির সারপ্রাইজ প্যাকেজ চন্দ্রচূড়ের চরিত্রে অনির্বাণ ভট্টাচার্য। গুমনামী হোক বা নেতাজী তাঁর দৃষ্টিকোণের সরণী বেয়েই দর্শকদের সামনে পৌঁছয়। আর শেষ দৃশ্যে তাঁর চোখের জল দর্শকের চোখের জলের প্রতিফলন হয়ে ওঠে। অনির্বাণ এককথায় অনবদ্য। ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের সঙ্গীত ছবির মেজাজের সঙ্গে যথাযথ। যেটুকু বাকি ছিল, ছবির শেষে ‘জনগণমন’ র মূর্ছনা তা পূর্ণ করে দেয়। প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়েও যা অনেকক্ষণ মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here