চন্দ্রযান ২ মিশন মহাকাশ গবেষণায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের কী এনে দিল সম্মান না অসম্মান?

0
207

শৌভিক দাস : অন্যকে ছোটো করে নিজে বড় হওয়ার চেষ্টা মানুষের অন্যতম এক বড় সমস্যা। কমবেশি এই দোষে দুষ্ট শিক্ষিত সংস্কৃতিবান থেকে আকাট মুর্খ সকলেই। কিন্তু বহু ব্যবহৃত এই পদ্ধতি যে ১০০ শতাংশ কার্যকর তা হলফ করে বলতে পারবেন না দৈনিক ব্যবহারকারীরাও। প্রতিটি ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত ঝোলা থেকে বিড়াল বেড়িয়েই পড়ে। পার্থক্য শুধু একটাই কোথাও বেশি সময় লাগে আবার কোথাও কম। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, ভারতের চন্দ্রযান ২-এর ল্যান্ডার বিক্রমের সাথে ইসরোর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে পাকিস্তানের বিজ্ঞান মন্ত্রী ফাওয়াদ চৌধরীর করা মন্তব্য। ৭ই সেপ্টেম্বর রাত ২টো ৬-এ তিনি ট্যুইট করে বলেন “যে কাজ পারো না সে কাজ করতে যাওয়া উচিত নয় এণ্ডিয়া”(লক্ষ্যনীয়)। হ্যাঁ তিনি “ইণ্ডিয়া” কে “এণ্ডিয়া”ই বলেছেন।

শুধু এই নয় এরপর রাত ২টো ১২-য় ফাওয়াদ চৌধরী ফের ট্যুইট করে আরও বলেন, “ঘুমিয়ে পড় ভাই, চাঁদের বদলে মুম্বাইয়ে হয়ত নেমে পড়েছে খেলনাটা”।

কোনও দেশের মন্ত্রীর মতো দায়িত্বপূর্ণ পদে বসে থাকা ব্যক্তির অন্য একটি দেশের ব্যক্তিগত বিষয়ে বিনা প্ররোচনায় এহেন দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য অনেকের কাছেই বেশ আশ্চর্যজনক বলে মনে হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, নিজেরা কিছু করতে না পারার গ্লানি কী এইভাবে অন্যের তথাকথিত ব্যর্থতার মাধ্যমে কাটবে? যদিও ফাওয়াদ চৌধরীর এইসব মন্তব্যের বিরোধিতা করে তাদের দেশের কয়েকজন নাগরিকরাও ট্যুইট করে তাকে এর জবাব দিয়েছেন।

নিন্দুকেরা ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর চন্দ্রযান ২ মিশনকে ব্যর্থ বলে মিথ্যে প্রচার করে আত্মতুষ্টিতে ভুগলেও। সারা পৃথিবী কিন্তু এরমধ্যেই সত্যিটা জেনে গেছে। চন্দ্রযান ২ মিশনের সফলতা নিয়ে ইসরো চেয়ারম্যান কে সিবনের দেওয়া শতাংশের হিসেবের বিতর্কের মধ্যে না ঢুকেও এই কথা অন্তত সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন যে, এক কথায় এই মিশনকে কিন্তু ‘সফল’ বা ‘ব্যর্থ’ বলে দেগে দেওয়া যায় না। মনে রাখা প্রয়োজন, কয়েকটি ধাপে বিভক্ত ভারতের চন্দ্রযান ২ এমন মিশন যা ভারতের ক্ষেত্রে কিন্তু এইরকম প্রথম একটি পদক্ষেপ। যার বেশ কয়েটি ধাপ পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ইসরো সফলভাবেই সম্পাদন করতে পেরেছে। চাঁদে অবতরণকালে শেষ মুহুর্তে ল্যান্ডার বিক্রমের সাথে ইসরোর গ্রাউন্ড স্টেশনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও ল্যান্ডার বিক্রম কিন্তু একাই চন্দ্রপৃষ্ঠে তার অবতরণের নির্দিষ্ট জায়গার মাত্র ৫০০ মিটারের মধ্যেই অক্ষতভাবে অবতরণ করতে পেরেছে। যদিও সেটা সফট ল্যান্ডিং হয়নি। আর একটি ব্যাপার হলো, ইসরোর চন্দ্রযান ২ মিশনটি এমন একটি মিশন যা ভারতীয় মহাকাশ প্রযুক্তির এক বিশেষ সফলতার মাইলফলক।

কিভাবে? ইসরোর পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ২২শে জুলাই অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটায় অবস্থিত সতীশ ধবন মহাকাশ কেন্দ্র থেকে জিএসএলভি মার্ক ৩ যানে চড়ে অরবিটার, ল্যান্ডার “বিক্রম” এবং রোভার “প্রজ্ঞান”-কে নিয়ে চাঁদের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল চন্দ্রযান ২। প্রায় ২৩ দিন ধরে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে করতে পৃথিবী থেকে একটু একটু করে নিজের দূরত্ব বাড়িয়ে গত ১৪ই আগস্ট চন্দ্রযান ২ পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে বেড়িয়ে চাঁদের দিকে এগিয়ে যায় এবং গত ২০শে অগাস্ট চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করে। তারপর পৃথিবী থেকে বেরিয়ে আসার ঠিক উলটো পদ্ধতিতে চাঁদকে প্রদক্ষিণ করতে করতে চাঁদের সাথে তার দূরত্ব কমিয়ে আনে চন্দ্রযান ২। গত ৭ই সেপ্টেম্বর ভারতীয় সময় রাত ১:৩০ নাগাদ ইসরোর পরিকল্পনা অনুযায়ী চাঁদের দক্ষিণ মেরুর একটি নির্দিষ্ট জায়গায় অবতরণ শুরু করে রোভার প্রজ্ঞান সমেত চন্দ্রযান ২-এর ল্যান্ডার বিক্রম।

এরপর চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে ২.১ কিলোমিটার উপরে থাকাকালীন সময়ে হঠাৎ কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ল্যান্ডার বিক্রমের সাথে সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায় পৃথিবীতে অবস্থিত ইসরোর গ্রাউন্ড স্টেশনের। এরফলে এককথায় ইসরোর কাছে হারিয়ে যায় ল্যান্ডার বিক্রম। অনভিপ্রেত অকস্মাৎ এই ঘটনায় বিহ্বল হয়ে পড়েন চন্দ্রযান ২ মিশনের সাথে যুক্ত থাকা সকল বিজ্ঞানী সহ সমস্ত ইসরো। এরপর এমন কিছু কার্যক্রম শুরু হয় ইসরোয় যা তাদের এই মিশনে পরিকল্পিত ছিল না। এইরকম এক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েও ভেঙে পড়েননি ইসরোর বিজ্ঞানীরা। তারা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় শুরু করেন ল্যান্ডার বিক্রমকে খোঁজার কাজ। এবং সৌভাগ্যবশত হারিয়ে যাওয়ার মাত্র ৩৬ ঘন্টার মধ্যেই তারা খুঁজেও পান বিক্রমকে। যদিও এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত বিভিন্ন চেষ্টা করেও তারা ল্যান্ডার বিক্রমের সাথে পুনরায় যোগাযোগ স্থাপন করে উঠতে পারেননি।

অন্যদিকে, ইসরোর গ্রাউন্ড স্টেশনের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও তার পূর্ব নির্দিষ্ট জায়গার মাত্র ৫০০ মিটারের মধ্যেই অক্ষত অবিস্থায় চাঁদের মাটিতে একাই অবতারণ করে ল্যান্ডার বিক্রম। এইসব ঘটনায় একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায় যে, স্বল্প সংস্থান সত্ত্বেও ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো তাদের পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিতে অন্যান্য দেশের প্রাচুর্যে ভরা মহাকাশ গবেষণায় সফল সংস্থাগুলির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার ক্ষমতা রাখে। সেই কারণে চন্দ্রযান ২ মিশন ১০০ শতাংশ সফল না হয়েও মার্কিন মহাকাশ গবেষক সংস্থা “নাসা”-র প্রশংসা আদায় করে নেয় ইসরো। এই বিষয়ে ট্যুইট করে নাসার পক্ষ থেকে জানানো হয়, “মহাকাশ একটি শক্ত জায়গা। আমরা ইসরোর চন্দ্রযান ২ মিশনের চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণের এই চেষ্টাকে প্রশংসা করছি। এই সফরের মাধ্যমে আপনারা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছেন। ভবিষ্যতে আপনাদের সাথে যৌথভাবে সৌরজগত নিয়ে কাজ করার সুযোগের অপেক্ষায় রইলাম।”

নাসার কথা মতো অনিশ্চয়তা ভরা মহাকাশের মতো কঠিন জায়গায় নির্দিষ্ট মিশনের বাইরে গিয়েও কাজ করার ক্ষমতা রাখে ইসরো। যা অভূতপূর্ব না হলেও এক বিরল ঘটনা। ইসরোর বিজ্ঞানীদের কুশলতার কারণেই হারিয়ে যাওয়ার মাত্র ৩৬ ঘন্টার মধ্যে চাঁদের মাটিতে খুঁজে পাওয়া গেছে ল্যান্ডার বিক্রমকে। নাসার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ১৯৫৮ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত মোট ১০৯ বার পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ চন্দ্র অভিযান করেছ। তবে ১০৯ বারের মধ্যে মাত্র ৬১ বারই সফলতা এসেছে এইসব অভিযানে। এই প্রেক্ষিতে মনে পড়ছে ইসরায়েলের এক মহাকাশ সংস্থা “স্পেসিএল”-এর ল্যান্ডার “ব্যারিসিট”-এর কথা। ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত স্পেসিএল নামে ইসরায়েলের এই মহাকাশ সংস্থা “গুগুল লুনার এক্স প্রাইজ” (জিএলএক্সপি) আয়োজিত চাঁদের মাটিতে মহাকাশযান প্রেরণের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে এইবছর (২০১৯) ফেব্রুয়ারি মাসের ২২ তারিখে ব্যারিসিট নামে একটি মুন ল্যান্ডারের সফল উৎক্ষেপণ করে।

গত ৪ঠা এপ্রিল ২০১৯ তারিখে ব্যারিসিট চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করে। এরপর গত ১১ই এপ্রিল ২০১৯ তারিখে চাঁদের মাটিতে অবতরণ করার সময় শেষ মুহুর্তে ভারতের চন্দ্রযান ২-এর ল্যান্ডার বিক্রমের মতোই ইজরায়েলের ল্যান্ডার ব্যারিসিটেরও যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তার গ্রাউন্ড স্টেশনের সাথে। এরফলে ব্যারিসিট চাঁদের পৃষ্ঠে সম্ভবত ভেঙে পড়ে বলে ধারণা করা হয়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে ব্যারিসিট হারিয়ে যাওয়ার ফলে ইজরায়েলের এই মিশন সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে যায়। চন্দ্রযান ২ মিশনে ভারতেরও অনেকটা ইজরায়েলের মতো অবস্থা হয়েছিল। যদিও ভারত চন্দ্রযান ২-এর অররিটারের মাধ্যমে ল্যান্ডার বিক্রমকে পুনরায় খুঁজে পেয়েছে। এই ঘটনা ইজরায়েলের সামনে তাদের হারিয়ে যাওয়া ল্যান্ডারকে খুঁজে পাওয়ার একটি আশার সৃষ্টি করেছে। চন্দ্রযান ২-এর অরবিটার যেহেতু চাঁদের চারিদিকে ঘুরছে এবং আগামী প্রায় ৭ বছর ধরে ঘুরবে তাই ইজরায়েল ভারতের কাছে তাদের হারিয়ে যাওয়া ল্যান্ডার ব্যারিসিটকে খুঁজে দিতে সাহায্য চেয়েছে। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো ইজরায়েলকে এই ব্যপারে সাহায্য করবে বলে জানা গেছে।

মানুষের মানসিকতা তার দৃষ্টিভঙ্গিকে আচ্ছন্ন করে রাখে। এই কারণে একটি অর্ধেক ভর্তি গ্লাসকে কেউ ব্যাখ্যা করে অর্ধেক ভর্তি হিসেবে আবার কেউ ব্যাখ্যা করে অর্ধেক খালি হিসেবে। তাই যারা চন্দ্রযান ২ মিশন ব্যর্থ বলে ধরে নিয়ে আরাম করে ঘুমোতে গিয়েছেন তাদের এই দিবাস্বপ্ন ভেঙে গিয়ে তারা যেন দ্রুত প্রকৃত বাস্তবের মুখোমুখি হোন এই কামনা করি। তথ্য, যুক্তির পরোয়া না করে বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে গায়ের জোরে হয়তো মিথ্যা প্রচার করা যায়। এবং সেই মিথ্যের প্রচারে হয়তোবা তাৎক্ষণিক সফলতাও পাওয়া যায়। তবে মিথ্যের বুনিয়াদের উপর নির্মিত সফলতার প্রাসাদ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এই বিষয়ে আলোচনা করুন সমালোচনা করুন তবে লক্ষ্য রাখুন তা অবশ্যই যেন হয় গঠনমূলক। অবোধের মতো একজনের ব্যার্থতায় খুশি না হয়ে তার সফলতায় উজ্জীবিত হয়ে উঠতে চেষ্টা করুন। তাতে আপনারাই সমৃদ্ধ হবেন। কারণ আপনি চোখ বন্ধ করে রাখলেও সবাইতো আর তা করে নেই!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here