“ফ্রুগাল সায়েন্স” আন্দোলনের পথে হেঁটে মনু-র সৃষ্টি “ফোল্ডস্কোপ”, এক ডলারের মাইক্রোস্কোপ

0
1244

শৌভিক দাস : “বিজ্ঞান শিক্ষা”-য় ফুটোস্কোপের কথা সেই কবে বলে গেছেন সুকুমার রায়। তবে ফুটোস্কোপ নয় আজ বলব “ফোল্ডস্কোপ” নিয়ে। আরেক ভারত সন্তানের মস্তিষ্কপ্রসূত এই ফোল্ডস্কোপ আসলে একটি বিশেষ ধরনের অণুবীক্ষণ যন্ত্র। শুনতে অবাক লাগলেও এই অণুবীক্ষণ যন্ত্রটি কাগজের তৈরি। অথচ অন্যান্য গতানুগতিক অণুবীক্ষণ যন্ত্রের তুলনায় অনেকবেশি টেকসই। যা জলে অথবা পাঁচতলা সমান উচ্চতা থেকে পড়ে গেলেও একই ভাবে কাজ করে, নষ্ট হয় না। এছাড়াও আরও অন্যান্য সুবিধাযুক্ত এই অণুবীক্ষণ যন্ত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এর সস্তা দাম। কতটা সস্তা? এই বিষয়ে একটা আভাস দিলেই সহজেই অনুমান করা যাবে যে এর দাম কত হতে পারে। ইতিমধ্যেই এই অণুবীক্ষণ যন্ত্রটি ‘এক ডলার মাইক্রোস্কোপ’ নামেও প্রচার পেয়েছে। তবে না এর দাম এক ডলার নয়, এর উদ্ভাবক এবং নির্মাতা মনু প্রকাশের মতে এই অণুবীক্ষণ যন্ত্রের উৎপাদন খরচ এক ডলারেরও কম। তাই বাজার চলতি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের তুলনায় ফোল্ডস্কোপ অনেকটাই সস্তা। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, মনু প্রকাশ ফোল্ডস্কোপ ছাড়াও “পেপারফিউজ” সহ নানা বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন এবং করছেন। তাঁর এই গবেষণার মূল আগ্রহের মধ্যে রয়েছে জল এবং কাগজের মতো মৌলিক পদার্থের গুণাবলীকে উদ্দেশ্যসাধনের উপায় হিসেবে ব্যবহার করা। মনু প্রকাশ তাঁর গবেষণাগারে এইসব যন্ত্রগুলি স্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত সুরক্ষার কাজে বিস্তৃতভাবে ও অধিক পরিমাণে উন্নয়নশীল দেশগুলিতে বৈজ্ঞানিক ব্যবহারে লাগার উদ্দেশ্য নিয়ে স্বল্প ব্যয়ে নির্মাণ করার চেষ্টা করে থাকেন। তাঁর এই আন্দোলনকে তিনি “ফ্রুগাল সায়েন্স” বলে আখ্যায়িত করেছেন।

কী এই ফোল্ডস্কোপ?

ফোল্ডস্কোপ আসলে একটি কাগজের তৈরি অপটিক্যাল মাইক্রোস্কোপ। যা ১৬৭০ সালে মাইক্রোবায়লজির জনক অ্যান্টনি ফিলিপস ভ্যান লেউওয়েনহোকের নিজে হাতে তৈরি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সিদ্ধান্তের উপর নির্মিত। অরিগ্যামির মতো কার্ডস্টক কাগজ ভাঁজ করে তাতে একটি কাঁচের লেন্স জুড়ে দিয়ে তৈরি করা হয় বলেই এর নাম “ফোল্ডস্কোপ”। তবে সামান্য এই আয়োজনে তৈরি এই অণুবীক্ষণ যন্ত্র খুব সামান্য নয়। মনু প্রকাশের দাবি, এই যন্ত্রে তিনি ২০ মাইক্রোমিটারের মতো ক্ষুদ্র অপটিক্যাল এ্যালাইনমেন্ট পর্যন্ত অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। নির্দেশ মেনে একটি কার্ডস্টক কাগজে আগে থেকেই পাঞ্চ করে কাটা ফোল্ডস্কোপের বিভিন্ন অংশ, গোলাকার কাঁচের লেন্স, একটি এলইডি, ব্যাটারি এবং একটি ডিফিউজার প্যানেল জুড়ে দিয়ে ব্যবহারকারী নিজেই তার ফোল্ডস্কোপ মাত্র সাত মিনিটের মধ্যেই তৈরি করে নিতে পারেন। একটি ফোল্ডস্কোপের সেটের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের লেন্স দেওয়া থাকে যেগুলোর সাহায্যে কোনও ক্ষুদ্র বস্তুকে ১৪০এক্স থেকে ২০০০এক্স পর্যন্ত বৃহত্তরীকরণ বা ম্যাগনিফিকেশন করা যেতে পারে। মাত্র ৮ গ্রাম ওজনের এই ফোল্ডস্কোপে একটি চুম্বক লাগানো থাকে যা কোনো স্মার্টফোনের সাথে ফোল্ডস্কোপকে জুড়তে সাহায্য করে। এই পদ্ধতিতে ব্যবহারকারী ফোল্ডস্কোপে ধরা কোনও ক্ষুদ্র বস্তুর ছবি তার স্মার্টফোনে তুলে নিতে পারেন।

মনু প্রকাশ ও তাঁর ফোল্ডস্কোপের জন্ম কথা

১৯৮০ সালে ভারতের উত্তরপ্রদেশের মীরাটে জন্মগ্রহণ করেন ফোল্ডস্কোপের আবিষ্কর্তা মনু প্রকাশ। ২০০২ সালে ভারতের আইআইটি কানপুর থেকে কম্পিউটার সাইন্স এবং ইইঞ্জিনিয়ারিং-এ বিটেক ডিগ্রি নিয়ে ২০০৮ সালে ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে অ্যাপ্লায়েড ফিজিক্সে পিএইচ. ডি. ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। এরপর ২০০৮ থেকে ২০১১ পর্যন্ত হার্ভার্ড সোসাইটি অফ ফেলোস-এ জুনিয়র ফেলো হিসেবে ছিলেন মনু প্রকাশ। ২০১১ পর তিনি স্ট্যান্ডফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ২০১৬ সালে তাঁকে ম্যাকআর্থার ফেলোশিপ পুরস্কার প্রদান করা হয়। বর্তমানে তিনি স্ট্যান্ডফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে বায়োইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত আছেন। তার সাথেই তিনি স্কুল অফ মেডিসিন অ্যান্ড দ্য সেন্টার ফর ইনোভেশন ইন গ্লোবাল হেলথে বায়োফিজিক্স প্রোগ্রামের একজন সদস্য। ইতিমধ্যেই তাঁর ঝুলিতে রয়েছে বেশকিছু নতুন আবিষ্কারের পেটেন্ট। এছাড়াও তাঁর লেখা গবেষণাপত্র গুলি ‘সাইন্স’; ‘নেচার’-এর মতো পৃথিবীর বিখ্যাত পত্রিকায় ছাপা হয়। তা সত্ত্বেও মনু প্রকাশকে আজ সারা বিশ্ব এককথায় ফোল্ডস্কোপের আবিষ্কর্তা হিসেবেই চেনে।

সেটা ছিল ২০১১ সাল। সেসময় থাইল্যান্ডের ফিল্ডস্টেশনে কর্মরত ছিলেন মনু প্রকাশ। তিনি লক্ষ্য করেন সেখানকার কর্মচারীরা প্রত্যেকে অণুবীক্ষণ যন্ত্রগুলো ব্যবহার করতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ খুঁজতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, অণুবীক্ষণ যন্ত্রগুলোর দাম তাদের মাইনের থেকেও বেশি। তাছাড়া আদতে ঠুনকো এইসব অণুবীক্ষণ যন্ত্রগুলো ব্যবহার করতে গিয়ে তাদের কাছে ভেঙে যাওয়ার ভয়ে তারা সবসময় চিন্তিত থাকেন। সেই সময় প্রথম তাঁর মাথায় সস্তা অথচ টেকসই এক অণুবীক্ষণ যন্ত্র বানানোর ধারণার জন্ম হয়। তিনি এমন এক অণুবীক্ষণ যন্ত্র বানানোর পরিকল্পনা করেন যা মাঠেঘাটে ব্যবহার করার মতো শক্তপোক্ত এবং বহুমুখী কর্মশক্তিসম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথে দামেও কম হবে। এরপর বিল এন্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন সহ বিভিন্ন সংস্থার অর্থ সাহায্যে মনু প্রকাশের নেতৃত্বে তাঁর প্রাক্তন ছাত্র জিম কিবলস্কির সহ একদল গবেষকের যৌথ গবেষণায় শেষমেশ ২০১৪ সালে আত্মপ্রকাশ করে ফোল্ডস্কোপের প্রোটোটাইপ বা আদিরূপ।

ভারত সহ বিভিন্ন দেশে ফোল্ডস্কোপের ব্যবহার

২০১৫ সালে ভারত সরকারের ডিপার্টমেন্ট অফ বায়োটেকনোলজি সারাদেশে তাদের মনোনীত ৮০ কলেজের বায়োলজি, কেমেস্ট্রি, ফিজিক্সের ছাত্রছাত্রীদের সুবিধার জন্য টিচিং টুল হিসেবে তাদের মধ্যে ফোল্ডস্কোপ বিতরণ করেন। এর পরবর্তীতেও তারা মনু প্রকাশের সাথে কাজ করে কম খরচে আরও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি তৈরি করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ফোল্ডস্কোপ ভারত ছাড়া উগান্ডা, কেনিয়াতেও উৎপাদিত এবং পরীক্ষিত হয়েছে। এছাড়াও মনু প্রকাশ এবং জিম কিবলস্কি “ফোল্ডস্কোপ ইন্সট্রুমেন্ট ইনকর্পোরেশন” নামে একটি কোম্পানির প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেখান থেকে ইতিমধ্যে তাঁরা কয়েক মিলিয়ন ফোল্ডস্কোপ বিভিন্ন জায়গায় বিতরণ করেছেন।

আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে বহু প্রতিভাবান ছাত্রছাত্রী তথা গবেষক শুধুমাত্র দামি বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির অভাবের কারণে উন্নত দেশের ছাত্রছাত্রী, গবেষকদের তুলনায় প্রতিনিয়ত পিছিয়ে পড়ছেন। তাদের কথা মাথায় রেখেই মনুর এই ফ্রুগাল সায়েন্স আন্দোলন। তারই ফসল হিসেবে ফোল্ডস্কোপের মত যন্ত্রের উদ্ভাবন তাদের কাছে অবশ্যই অন্ধকারে একটি আশার আলো। যদিও এ-তো সবে শুরু কারণ নিজের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করলেও বিশেষ কিছু কারণে এখনও ফোল্ডস্কোপ মেডিক্যাল ডাইগোনস্টিক টুল হিসেবে ব্যবহার করা হয় না। তাই শুরুটা ভালো হলেও এই নতুন পথের যাত্রা কিন্তু লম্বা তবে আশাপ্রদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here