তাঁর নামেই তাঁকে দেওয়া হয়েছে পাণ্ডিত্যের উপাধি, তিনি প্রকৃত অর্থে ‘পঞ্চানন’

0
1157

শৌভিক দাস : আচ্ছা, আপনারা যদি এমন কোনো চিকিৎসকের সামনে গিয়ে পড়েন যিনি আপনি কিছু বলার আগেই শুধুমাত্র আপনাকে স্পর্শ করেই একে একে আপনার শরীরের যাবতীয় অসুবিধার কথা নিজে থেকে বলতে শুরু করবেন, কেমন হবে ব্যাপারটা? না, কল্পবিজ্ঞানের কোনও গল্প থেকে ধার করে বলছি না। বিশ্বাস করুন বিস্ময়কর হলেও এটা পাহাড়, নদী, গাছপালা, এমনকি আমার আপনার মতোই ঘোর বাস্তব। জানি এখনও বিশ্বাস করতে অসুবিধা হচ্ছে অনেকের। তবে অবিশ্বাসী পাঠককে এখানে দোষ দেওয়া যায় না। আজকাল যেখানে হাজারটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরও অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক রোগ নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না সেখানে শুধুমাত্র স্পর্শ করে কারোর রোগ এবং রোগের লক্ষণ বলে দেওয়ার কথা তাদের কাছে ভেলকিবাজির মতোই লাগবে বৈকি! রহস্য এবার একটু লঘু করা যাক। আসলে ‘স্পর্শ’ বলতে আমি বলতে চাইছি নাড়ি টিপে রোগ এবং রোগের লক্ষণ বলে দেওয়া। এবার হয়ত আরও কিছু পাঠক আমার কথায় আশ্বস্ত হলেন। তবে এখনও যারা হলেন না তাদের উদ্দেশ্যে বলি, সত্যিই হাতের নাড়ি টিপে রোগের লক্ষণ বুঝে রোগ বলে দেওয়া যায়। যদিও বিষয়টি অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, প্রথমে আমার নিজেরও মনে হয়েছিল। তবে অভিজ্ঞতা, অধ্যাবসায়, এবং আয়ুর্বেদের জ্ঞান থাকলে হাতের নাড়ি টিপে রোগ এবং রোগের লক্ষণ বিষয়ে বলা সম্ভব। আমাদের দেশের আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে আগেকার দিনে এইভাবেই নাড়ি টিপে ‘বায়ু’, ‘পিত্ত’, ‘শ্লেষ্মা’-র প্রকোপ অথবা ক্ষীণতার উপর ভিত্তি করে সঠিকভাবে রোগ নির্ধারণ করতেন আয়ুর্বেদ চিকিৎসকগণ। তবে আজকাল এমন মানুষ কমতে কমতে হাতে গোনা কয়েকজনে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আমার সৌভাগ্য, এমনই একজন মানুষকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি।

শ্রী পঞ্চানন চক্রবর্তী, কবিরঞ্জন স্মৃতি ব্যাকরণতীর্থ

তাঁর নাম করলেই তাঁকে যারা চেনেন তাদের তাঁর প্রতি শ্রদ্ধায়-ভক্তিতে-আস্থায় এবং তাঁর পাণ্ডিত্যে নিজে থেকেই মাথা নত হয়ে আসে। তিনি হলেন রায়গঞ্জ তথা উত্তরবঙ্গ এমনকি সারা রাজ্যের মধ্যে অন্যতম সুপণ্ডিত, আয়ুর্বেদ চিকিৎসক শতোর্ধ শ্রী পঞ্চানন চক্রবর্তী। সরকারি হিসেবে বয়স ১০৫ বছর হলেও তিনি নিজেই বলেন তাঁর এখন ১০৯ চলছে। এই বয়সেও যথেষ্ট তরুণ তিনি। ক্ষীণকায় চেহারায় এখনও নিজেই লাঠি নিয়ে হাঁটাচলা করতে পারেন। সংখ্যায় কম হলেও এখনও রোগী দেখেন। এখনও তাঁর স্মৃতি তীক্ষ্ণ। কোনও প্রসঙ্গে কথার বলার আগে অনায়াসে এখনও আওড়ান বেদ, গীতা, উপনিষদ মায় আয়ুর্বেদ থেকে সংস্কৃতের নানা শ্লোক। তারপর অবশ্যই আমার মতো মুখ্যুর জন্য তা বাংলায় ব্যাখ্যা করে সেই সূত্র ধরে প্রসঙ্গে প্রবেশ করেন। তাঁর প্রেসক্রিপশনে তাঁর নামের পাশে জ্বলজ্বল করে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘কবিরঞ্জন স্মৃতি ব্যাকরণতীর্থ’। তিনি নিজে এই ডিগ্রির ব্যাখ্যা না দিলে হয়ত বুঝতে একটু কষ্ট হতো। তবে আমি আমার ভাষায় এর ব্যাখ্যা করছি। মানে আমি যা বুঝতে পেরেছি আরকি, ‘কবিরঞ্জন’ অর্থাৎ আয়ুর্বেদ চিকিৎসক বা কবিরাজ, ‘স্মৃতি’ এই ডিগ্রি তিনি অর্জন করেছেন হিন্দু শাস্ত্রের উপর পড়াশোনা করে।তাঁর ছেলেদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি এই ডিগ্রির বলে কোনও হিন্দু ব্যক্তির ধর্মচারণে কোনও রকম সংকট এলে তিনি সেই পরিস্থিতি থেকে তাকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য ধর্মের বিধান দেওয়ার অধিকার রাখেন এবং এই রাজ্যে তিনিই একমাত্র এই ডিগ্রিধারী জীবিত ব্যক্তি। ‘ব্যাকরণ’ এই ডিগ্রি তিনি অর্জন করেছেন সংস্কৃত ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জনের কারণে। সর্বশেষ ‘তীর্থ’ না এটা কোনও বিষয়ের ডিগ্রি নয় তিনি যা বললেন এর অর্থ ‘স্নাতক’। যাইহোক তাঁর ডিগ্রি নিয়ে এরচেয়ে বেশি ব্যাখ্যা করতে গেলে আমার পাণ্ডিত্যে টান পড়তে পারে তাই প্রসঙ্গ পরিবর্তন করলাম। আজকাল চোখে খুব ভালো দেখতে পান না তিনি। লিখতেও অসুবিধে হয়। তবে নাড়ি টেপা তাঁর দু’হাতের তিনটি আঙুলের অনুভূতি আজও প্রখর। যার সাহায্যে তিনি এখনও রোগীকে না জিজ্ঞেস করেই রোগের নানান লক্ষণ নিজে থেকেই বলে দেন। যার সাক্ষী আমি নিজেই। তিনি তাঁর দু’হাতের তর্জনী, মধ্যমা আর অনামিকা দেখিয়ে মজা করে বলেন আমার এই আঙুলগুলোতে কান রয়েছে।

“শত মারি ভবেৎ বৈদ্য, সহস্র মারি চিকিৎসক”

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই তিনি আয়ুর্বেদ চর্চা এবং চিকিৎসা শুরু করেন। সেই মোতাবেক তাঁর ঝুলিতে ৭০ বছরেরও বেশি দিনের অভিজ্ঞতা আছে চিকিৎসক হিসেবে। তবে তাঁকে চিকিৎসক হিসেবে সম্বোধন করলে তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে আয়ুর্বেদ শাস্ত্র থেকে উদ্ধৃতি দেন, “শত মারি ভবেৎ বৈদ্য, সহস্র মারি চিকিৎসক। অর্থাৎ যাঁর হাতে একশ জন রোগী মারা গেছে তিনি হলেন ‘বৈদ্য’ আর যাঁর হাতে হাজার জন রোগী মারা গেছে তিনি হলেন ‘চিকিৎসক’। আর আমি আজও বৈদ্যই হতে পারিনি তো চিকিৎসক!” তাঁর এই বিনয়ের মধ্যে নেই কোনও লুকোনো অহংকার কারণ তিনি সারাজীবন এই বিশ্বাসই বহন করে এসেছেন চিকিৎসক হিসেবে। তবে নিজের সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমি ছিলাম অত্যন্ত অধ্যবসায়ী। আমার মনে হতো আমার সামনে রোগীটা মারা যাবে আমি কিছু করতে পারবো না? তাই শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে যেতাম।” তিনি গবেষণা করে তৈরি করেছেন বাতের চিকিৎসার জন্য ‘বাতঘ্নী সালসা’, যকৃতের চিকিৎসার জন্য ‘কালমেঘ’-এর মতো নতুন নতুন অনেক ওষুধ। তাঁর কাছে রায়গঞ্জ ছাড়াও উত্তরবঙ্গ তথা দক্ষিণবঙ্গ এমনকি রাজ্যের বাইরে থেকেও রোগী আসেন। কিন্তু প্রচারহীন হয়েও কিভাবে তাঁর খোঁজ পৌঁছে যায় দূর-দূরান্তের রোগীদের কাছে? এবারে উত্তর দিলেন তাঁর ছেলে তথা কবিরাজি চিকিৎসায় উত্তরসূরী কবিরাজ মহাদেব চক্রবর্তী। বললেন, বিভিন্ন সময়ে তাঁদের কাছে চিকিৎসা করিয়ে যারা উপকৃত হয়েছেন তাদের মুখেমুখেই দূর-দূরান্তে এই প্রচার হয়েছে। তিনি আরও জানান, “শুধুমাত্র চিকিৎসার জন্যই নয় বাবার কাছে বিভিন্ন জন আসেন তাঁর পাণ্ডিত্যের ছোঁয়া পেতে। এই যেমন গত বছরই বাবার কাছে কলকাতা থেকে এসেছিলেন পরিবেশ গবেষক জয়া মিত্র। বাবার সাথে তিনি ‘চতুষ্পাঠী’ নিয়ে আলোচনা করেন। এছাড়াও তাঁর কাছে বিভিন্ন সময় হিন্দু ধর্মের বিধান নেওয়ার জন্য রায়গঞ্জ ও রায়গঞ্জের বাইরে থেকেও আসেন বিভিন্ন মানুষ।”

সংগ্রামের সেই দিনগুলো

১৯১১ সালে অধুনা বাংলাদেশের ঢাকা বিভাগের গাজীপুর জেলার তৎকালীন কালিয়াকৈর থানায় (বর্তমানে কালিয়াকৈর উপজেলা) জন্মগ্রহণ করেন পঞ্চানন চক্রবর্তী। তিনি বাংলাদেশের শিমুলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে ওই বিদ্যালয়েই কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। ম্যাট্রিক পাশ করেই তিনি শুরু করেন তাঁর আয়ুর্বেদ শিক্ষা। এইসময় তিনি অধ্যাপক শ্রীকুমার দাসে সান্নিধ্যে আসেন। অধ্যাপক দাসের কাছেই তাঁর ভেষজ জ্ঞানের হাতেখড়ি হয়। এরপর আরও বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে আয়ুর্বেদ শাস্ত্র, স্মৃতি, ব্যাকরণ কাব্য অধ্যয়ন করেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি সাভারের মনমোহন ঔষধালয় থেকে আয়ুর্বেদের ‘কবিরঞ্জন’ উপাধি লাভ করেন। এরপর ‘৪৭-এ দেশভাগের সময় তিনি বাধ্য হয়ে স্ত্রী এবং দুই শিশু পুত্র পবিত্র এবং পরিমলের হাত ধরে এপারে চলে আসেন। এপারে এসে আসামের তৎকালীন বরপেটা মহুকুমার হাউলীতে বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। দেশে একরকম চললেও নতুন জায়গায় এসে শুরু হয় তাঁর পরিবার-সন্তানদের নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই। সেসময় তিনি আয়ুর্বেদ চর্চার পাশাপাশি সংসার চালানোর জন্য শুরু করেন জাজনিক কর্ম এবং ছাত্র পড়ানো। এরপর ১৯৪৮ সালে আসামের বিভিন্ন অংশে অসমিয়া এবং বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে জাতিগত দাঙ্গা শুরু হলে তিনি ১৯৪৯-৫০ সাল নাগাদ সেখান থেকে জলপাইগুড়িতে চলে আসেন। জলপাইগুড়িতে এসে তিনি সোনাউল্লা উচ্চ বিদ্যালয়ে সংস্কৃতর শিক্ষকতা শুরু করেন। কিন্তু সেখানেও বেশি দিন থিতু হতে পারেননি তিনি। পরে ১৯৫৫-৫৬ সাল নাগাদ তিনি পরিবার নিয়ে চলে আসেন রায়গঞ্জে। শুরু করেন সুভাষগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা। তার সাথেই পরিবার চালানোর তাগিদে সমানতালে চলতে থাকে জাজনিক ক্রিয়াকলাপ, ছাত্র পড়ানো এবং অবশ্যই আয়ুর্বেদ চর্চা তথা চিকিৎসা। তারমাঝে কিছুদিন তিনি রায়গঞ্জ মোহবাটী বিদ্যালয়েও ডেপুটেশনে শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। এরপর রায়গঞ্জে একটু একটু করে আয়ুর্বেদ চিকিৎসক হিসেবে জমতে শুরু করে পসার। ততদিনে ধীরেধীরে সংসারও বড় হয়েছে। জন্ম হয়েছে আরও চার ছেলে এবং ছয় মেয়ের। ১৯৫৯-৬০ সাল নাগাদ তিনি স্থির করলেন সব ছেড়ে এবার মনোযোগ দিয়ে পাকাপাকিভাবে শুরু করবেন আয়ুর্বেদ চর্চা ও চিকিৎসা। প্রতিষ্ঠা করলেন ‘পবিত্র আয়ুর্ব্বেদ চিকিৎসালয়’। সেই থেকে প্রকৃত অর্থে নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একটু একটু করে কবিরাজ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করলেন পঞ্চানন চক্রবর্তী। সংগ্রামের সেসব দিন পার হয়েছে বেশ কিছু কাল। তাঁর নেপথ্য প্রচেষ্টায় সন্তানরা আজ সকলে সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেই দিনের সেই সংস্থা ‘পবিত্র আয়ুর্ব্বেদ চিকিৎসালয়’ আজ এমন স্বাবলম্বী হয়েছে যে তার উপর নির্ভর করে কয়েকটি দুঃস্থ পরিবারের আজ রোজগারের উপায় হয়েছে। এখনও প্রতিদিন তাঁর কাছে অনেক মানুষ আসেন চোখের দেখা দেখে তাঁকে প্রণাম করে তাঁর আশীর্বাদ নিয়ে যেতে। আর ধর্মপ্রাণ মানুষটি এই বয়সের নানা শারিরীক অসুবিধা সত্ত্বেও হাসিমুখে মন উজার করে তাদের আশীর্বাদ করেন শুভকামনা করেন।

বটবৃক্ষের মত তাঁর ছায়া শান্তি দেয় জীবন পথিকদের

সব কর্তব্যের দায় থেকে মুক্ত হলেও তিনি আজও সকলের মাথার উপর বটবৃক্ষের মত ছায়া ধরে রেখেছেন তাঁর মনীষা, প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা এবং মানবিকতা দিয়ে। তাঁর সুকোমল ছায়ার আশ্রয় এখনও শান্তি দিয়ে যায় কাছের-দূরের ক্লান্ত জীবন পথিকদের। আমাদের সমাজে এমন শান্তির বটবৃক্ষের আজ বড় প্রয়োজন। তাই আসুন সকলে তাঁর সুস্থতা ও আরও দীর্ঘ জীবন কামনা করি।

উদ্দেশ্য ছিল ‘চিকিৎসক দিবস’ উপলক্ষে শ্রী পঞ্চানন চক্রবর্তী নিয়ে এই লেখা লেখার। কিন্তু তাঁকে জানতে যত গভীরে গিয়েছি তত মনে হয়েছে কেন চিকিৎসক দিবস? সংবাদ বা প্রচার মাধ্যমে অতি অল্প প্রচারিত এইরকম একজন ব্যক্তিত্বের জন্য আলাদা একটা দিন হওয়াই উচিত। তাঁর সম্পর্কে জেনে এক অর্থে সমাজ উপকৃতই হবে বলে আমার বিশ্বাস। চিকিৎসক দিবসে অন্যান্য লেখার মধ্যে যেন এই লেখা না হারিয়ে যায় তারজন্যই আজ এই লেখা প্রকাশিত হলো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here