স্কুটারে করে মাকে দেশের সমস্ত তীর্থস্থান দর্শন করাচ্ছেন ছেলে

0
720

সুশান্ত নন্দী, ইসলামপুর: মাতৃভক্তির এহেন বিরল নিদর্শন কলিযুগে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ আছে। শুধুমাত্র মায়ের তীর্থ দর্শন এর ইচ্ছে পূরণ করতেই নিজের মোটা মাইনের বহুজাতিক সংস্থার চাকরি ছেড়ে প্রায় দেড় বছর ধরে গোটা দেশজুড়ে ভাঙাচূড়া স্কুটারে করে মাকে তীর্থস্থান দর্শন করাচ্ছেন ছেলে কৃষ্ণ কুমার। এই দীর্ঘ সময়ে দেশের তেরোটি রাজ্যের সীমানা অতিক্রম করে সেখানকার মূল তীর্থস্থান গুলি দর্শন করে বুধবার রাতে এসে পৌঁছেছেন উত্তর দিনাজপুর জেলার ইসলামপুর। এখানে এসে তিনি জানান, তার মা একজন কর্মব্যস্ত একাত্তর বছর বয়সী মহিলা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বাড়ির কাজ এবং তাদের পরিষেবা দিতেই সময় কেটে যেত। কখনো বাড়ির বাইরে যাবার সময় হয়নি।

এমনকি বাড়ি থেকে খুব কাছে যে তীর্থস্থান রয়েছে তাও দেখা সম্ভব হয়নি। তাই মায়ের কাছ থেকে এমন শোনার পর যেন কৃষ্ণ কুমারের বিবেক দংশন হতে থাকে এবং সেখান থেকে জন্ম নেয় এই ইচ্ছে। অর্থাৎ বাড়ির সামনের একটি দুটি স্থান নয় বরং ভারতবর্ষে যত তীর্থস্থান আছে তিনি মাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে দেখাবেন। তীর্থস্থান দর্শন করাবেন। বাবার মৃত্যুর পর বাবার ব্যবহার করা একটা স্কুটার ছিল বাড়িতে। সেই ভাঙাচোরা স্কুটার মেরামত করে গত ২০১৮ সালের ১৪ ই জানুয়ারি মাকে নিয়ে অনির্দিস্টের ঠিকানায় বেরিয়ে পড়ার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য বউ জাতিক সংস্থার মোটা মাইনের চাকরি ছেড়ে দেন। এরপর ১৬ ই জানুয়ারী তিনি বেরিয়ে পড়েন। সেই শুরু। এরপর পেরিয়ে গেছে প্রায় দীর্ঘ দেড় বছর। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্য এভাবেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মাকে তীর্থস্থান দর্শন করাচ্ছেন এবং একই সঙ্গে তীর্থস্থানের পাশাপাশি অন্যান্য পর্যটন কেন্দ্রের ঠিকানাগুলিও তারা  ঘুরে দেখছেন এবং উপভোগ করছেন। স্কুটার এর বিভিন্ন জায়গায় বাধা রয়েছে মাত্র ছয়টি ব্যাগ। প্রয়োজনীয় কাপড় জামা এবং কিছু ঘরোয়া খাবার রয়েছে সেখানে।

অবিবাহিত চল্লিশের যুবক কৃষ্ণ কুমার কবে বাড়ি ফিরবেন তা জানা নেই। উদ্দেশ্য, কিন্তু এবার ভারতবর্ষের সমস্ত তীর্থ স্থান গুলো শেষ করতে হবে। তার জন্য যতদিন এবং যত মাস প্রয়োজন তিনি মাকে সঙ্গে নিয়ে এভাবেই ঘুরতে মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে রয়েছেন। তবে কারও দেওয়া উপহার কিংবা টাকা তারা কখনোই গ্রহণ করেন না। তার এবং তার বাবার জমানো অর্থ রাশি যা  ছিল সবই ব্যাংকে জমা করেছেন। আর সেই ব্যাংকে জমাকৃত টাকার সুদ থেকেই তারা এখানে তা খরচ করছেন। চলে যাচ্ছে দিব্বি। যেখানে থাকেন সেখানে গিয়ে খুঁজছেন কোন আশ্রম বা ধর্মশালা এই জাতীয় কম খরচে থাকার জায়গা ।কারণ ত তারা শুধুমাত্র যে উদ্দেশ্য নিয়ে বেড়িয়েছেন তা সফল করতে হবে। সেখানে বিলাসবহুল জীবন যাত্রা তাদের ঠিক মানায় না।

দক্ষিণ ভারতের একাধিক রাজ্যের ভাষা জানেন কৃষ্ণকুমার। হিন্দী এবং ইংরেজতে অত্যন্ত দক্ষ এবং পটু। মানুষের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে জানেন। তেমনই এই দীর্ঘ পথে অনেক  ভালো মনের মানুষের সঙ্গে তাদের দেখা হয়েছে এবং যোগাযোগ হয়েছে। এমনকি অনেক জায়গায়  যেন আত্মীয়তা এবং বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে।অন্য ভাষাভাষী হলেও মানুষ মানুষের জন্য এই নীতিতে বিশ্বাসী তিনি। তাই এ দীর্ঘ পথে অনেক কাছের মানুষ কে পেয়েছেন তিনি। অনেকের বাড়িতে আতিথেয়তাও গ্রহণ করেছেন তারা দুজন।এহেন মাতৃভক্তির বিরল নিদর্শন ভারতবর্ষের আর কোথাও আছে কিনা এই মুহূর্তে তা খুঁজে বের করা বড় মুশকিল ।এর আগেও মাকে নিয়ে ২০১৭ সালে গাড়ি করে কাশ্মীর সহ অন্যান্য বেশ কয়েকটি জায়গা ঘুরেছিলেন তিনি।  তবে সময়সীমাটা এর তুলনায় অনেক কম ছিল। কারণ তখন ছিলেন তিনি চাকুরীরত। মা কে সঙ্গী করে ছেলে বাবার ব্যবহৃত স্কুটার এর স্মৃতি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মা বলছেন এমন ছেলে গর্ভে ধারণ করাও যেন জন্ম-জন্মান্তরের শান্তি। কারণ তার ইচ্ছে এমন ভাবে তার ছেলে পূরণ করবে তা তিনি স্বপ্নেও কখনো ভাবতে পারেননি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here