প্রসঙ্গ বৃক্ষরোপণ : অনুকরণীয় এই উদ্যোগ কবে গৃহীত হবে এই দেশে?

0
1162

শৌভিক দাস: আচ্ছা আমাদের দেশে এমন যদি কোনও আইন করা হতো যে, দেশের প্রত্যেক সরকারি (রাজ্য এবং কেন্দ্রীয়) চাকুরেদের বছরে একটি করে গাছ লাগাতে হবে এবং তাকে যত্ন করে বড় করতে হবে নতুবা তাদের মাইনার বার্ষিক বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যাবে। না, সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কোন রকম বিরূপ মানসিকতা নিয়ে এই লেখা নয়। বিষয়টা একেবারেই অন্য। আশাকরি আমরা প্রত্যেকেই একটা বিষয়ে অবগত এবং একমত যে, সারা পৃথিবীতে বৃক্ষ ছেদনের ফলে প্রকৃতির উপর তার একটা ব্যাপক প্রভাব পড়েছে এবং গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর জন্য তা অনেকাংশেই দায়ী।

হঠাৎ করে সরকারি কর্মচারীদেরকে এক্ষেত্রে টেনে আনার বিষয়ে একটা পরিসংখ্যান দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যেতে পারে। ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী ভারতবর্ষের আয়তনের ২১.৫৪ শতাংশ অরণ্য ভূমি। যেখানে ভারতের নিজের তৈরি নীতি অনুযায়ী তা ৩৩ শতাংশ থাকার কথা। এছাড়াও ২০১৮ সালের অন্য আরেকটি তথ্য বলছে সারা ভারতবর্ষে রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় মিলিয়ে মোট সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা ২.১৫ কোটির বেশি। সেক্ষেত্রে প্রতিটি সরকারি কর্মচারী যদি বছরে একটি করেও গাছ লাগান তবে প্রতিবছর শুধুমাত্র সরকারি কর্মচারীদের হাতেই ২.১৫ কোটির বেশি গাছ লাগানো সম্ভব হবে আমাদের দেশে। অনেকের মনে হতে পারে কী কারণে হঠাৎ করে এমন এক উর্বর চিন্তাভাবনা বিকাশ? আসলে গতকাল একটা খবরে চোখ আটকে গিয়েছিল এবং তারই ফলস্বরূপ এই উর্বর চিন্তার অঙ্কুরোদগম। এছাড়া উদাহরণ হিসেবে শুধুমাত্র সরকারি কর্মচারীর নাম করলেও এক্ষেত্রে পাঠকদের কাছ থেকেই বেরিয়ে আসবে আরও অন্যান্য সম্ভাব্য সম্প্রদায়ের নাম যাদের দিয়ে এই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব, এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

ফিলিপিন্সে ব্যাপক বৃক্ষ ছেদনের ফলে সেদেশে বনভূমি ৭০ শতাংশ থেকে কমে ২০ শতাংশে চলে এসেছে। এবং এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় সেদেশের সরকার এক অভিনব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন যাতে প্রতিবছর সেখানে সাড়ে ১৭ কোটির বেশি গাছ লাগানো সহ সেগুলোকে যত্ন সহকারে বড় করা সম্ভব হয়। ইতিমধ্যেই সেখানে এই সংক্রান্ত একটি বিল পাশ করা হয়েছে। যার ফলে সেদেশের প্রতিটি ছাত্রছাত্রীকে স্নাতক হতে গেলে বাধ্যতামূলকভাবে ১০টি করে গাছ লাগাতে হবে। ফিলিপিন্সের সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে এই আইন পাশ হয়েছে যা “গ্রাজুয়েশন লিগাসি ফর দ্যা এনভায়রনমেন্ট অ্যাক্ট” নামে পরিচিত। ফিলিপিন্স সরকারের এই আইনের আওতায় রয়েছে সেদেশের সকল এলিমেন্টরি বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয় তথা মহা বিদ্যালয়গুলির ছাত্রছাত্রীরা।

এই বিষয় নিয়ে ফিলিপিন্স সরকারের তৎপরতাও বেশ চোখে পড়ার মতোই। সেদেশের সরকার ইতিমধ্যেই ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে প্রতিবছর এইসব গাছ যেসকল জায়গায় লাগানো হবে তা নির্দিষ্ট করে ফেলেছেন। সেগুলির মধ্যে রয়েছে সাধারণ বনাঞ্চল, ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, স্থানীয় আদিবাসীদের জমি, অসামরিক ও সামরিক সংরক্ষিত এলাকা, অব্যবহৃত এবং পরিত্যক্ত খনি এলাকা, এমনকি শহুরে জমিও। প্রতিক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারি সংস্থাগুলির উপর ন্যস্ত থাকবে এইসব গাছগুলির পর্যবেক্ষণের দ্বায়িত্ব। তারাই এইসব গাছগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সব রকমের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। স্থানীয় জলবায়ু এবং ভূপ্রকৃতির সাথে সাযুজ্য রেখে নতুন লাগানো গাছগুলিও হবে সেদেশের স্থানীয় এবং দেশি প্রজাতির।

প্রতিবছর ফিলিপিন্সের এলিমেন্টরি বিদ্যালয় থেকে ১২ লক্ষ, উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৫০ লক্ষ এবং মহা বিদ্যালয় থেকে ৫ লক্ষ ছাত্রছাত্রী স্নাতক হন। তাদের সকলের দ্বারা লাগানো গাছের পরিমান সবে মিলে দাঁড়ায় বছরে সাড়ে ১৭ কোটিরও বেশি। এই হিসেবে এক প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীদের হাতে ৫২ হাজার ৫০০ কোটি গাছ লাগানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন “গ্রাজুয়েশন লিগাসি ফর দ্যা এনভায়রনমেন্ট অ্যাক্ট”-এর রচয়িতা গ্রেরি অ্যালহানো। ফিলিপিন্স সরকারের এই প্রচেষ্টা যে অবশ্যই প্রসংশার দাবি রাখে তা আলাদা করে উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই।

এর পাশাপাশি আমাদের দেশের দিকে তাকালে চিত্রটা এইরকম ২০০৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী অরণ্য ছেদনে ভারতের স্থান পৃথিবীতে দশম। ২০১৫ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে ভারতে ২০ হাজার হেক্টর বনভূমি ছেদন করা হয়েছে যা আয়তনে কলকাতা শহরের প্রায় সমান। এছাড়াও রয়েছে বৃক্ষ ছেদনের নানারকম এটা ওটা সেটা উদাহরণ। সরকারের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে জনসচেতনতা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে চোখে পড়ার মতো কোনও রকম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নেই। যদিও এইসব ব্যপারে জনসচেতনতামূলক প্রচার বিশেষভবে কার্যকরী। তবে রয়েছে আইন। ইণ্ডিয়ান ফরেস্ট অ্যাক্ট অনুযায়ী বৃক্ষ ছেদনে ১০ হাজার টাকার জরিমানা সহ ৩ মাসের কারদণ্ডের বিধান আছে। কিন্তু এই আইনের খুব কার্যকর ভূমিকা এখনও সচরাচর দেখা যায় না।

অন্যদিকে, ভারত সরকার ১৯৯২ “দ্যা ন্যাশনাল অ্যাফরেস্টেশন অ্যান্ড ইকো-ডেভলপমেন্ট বোর্ড” সংক্ষেপে “এনএইবি” নামে একটি সংস্থা গঠন করে বাস্তুতন্ত্র রক্ষার উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বৃক্ষরোপণ, অরণ্য সৃজন সহ নানা কর্মকাণ্ড করে চলেছেন নিভৃতে নিশ্চুপে। তবু্ও এক্ষেত্রে মনে পড়ে যায় যশোর রোডের প্রায় চারশো বছরের পুরোনো গাছ গুলির কথা। যদিও ফিলিপিন্স সরকারের অভিনব এই উদ্যোগ দেখে এবং আমাদের দেশের সংবিধান থেকে শুরু করে হালের বুলেট ট্রেনের প্রসঙ্গে স্মরণে আসে অন্য দেশের ভালো জিনিস অনুকরণ করার প্রতি আমাদের দেশের সুদীর্ঘ ইতিহাসের কথা। তাই অরণ্য ছেদনে ভারতের স্থান পৃথিবীতে দশম হলেও আশাহত হচ্ছি না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here