এপ্রিলের কাঠফাটা রোদ্দুরে ‘অক্টোবর ‘ এর স্নিগ্ধ পরশ মন ও মননে অপূর্ব শীতলতার সঞ্চার করে, চাওয়া পাওয়াহীন নিঃশর্ত ভালোবাসার গাথা রচনা করলেন সুজিত

0
223
অভিনয়ঃ বরুন ধাওয়ান, বনিতা সান্ধু, গীতাঞ্জলি রাও।
পরিচালকঃ সুজিত  সরকার
রেটিংঃ ৪/৫
দেবলীনা ব্যানার্জীঃ সুজিত সরকার বরাবরই মানবিক সম্পর্কের সূক্ষ্মতা তুলে ধরতে পছন্দ করেন । এপ্রিলের গরমে ‘অক্টোবর’-এর স্নিগ্ধতা দিয়ে মনকে জুড়িয়ে দিয়ে ঠিক এই কাজটাই করলেন পরিচালক। রোজকার চাওয়া না পাওয়ার মধ্যেই কোনওভাবে চলছিল ড্যানের জীবন। জীবনে সবকিছুর উপরই বীতশ্রদ্ধ সে। সব খারাপই যেন তাঁর সঙ্গেই হয়। এমন ধারণা নিয়েই বাঁচে সে। কিন্তু শিউলি নামের মেয়েটার হঠাৎ এমন কেন হল? ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার আগে কেন সে তাঁর খোঁজ করছিল? নিছকই কৌতূহল। কৌতূহল থেকে আগ্রহ। আগ্রহ থেকে টান। সেই অমোঘ টান যা অস্বীকার করা অসম্ভব। ভালবাসা মানেই তো কেবল পাওয়া কিংবা চাওয়া নয়। শরীর সর্বস্ব এ জীবন নয়। মন বলেও একটি বস্তু রয়েছে। সেটা আবার প্রমাণ করল ড্যান। ফিরিয়ে দিল অবোধ মনের ভালবাসার গন্ধ। যে গন্ধ তাঁর শিউলির মতোই তাজা।
ছবিতে মনে হয় না কেউ অভিনয় করেছেন! সবটাই এত বাস্তবের রাস্তায় ধরা ফ্রেম! ‘স্টুডেন্ট অফ দ্য ইয়ার’-এর খোলস ছেড়ে অনেকদিনই বেরিয়ে এসেছেন বরুণ ধাওয়ান। তিনি যে কেবল পরিচালক বাবার পুত্র হিসেবে অভিনয় জগতে আসেননি তা ‘বদলাপুর’-এই প্রমাণ করেছিলেন। কিন্তু ‘অক্টোবর’ উপহার দিল অন্য বরুণ ধাওয়ান। এই ভদ্রলোক সত্যি ডিরেক্টর’স অ্যাক্টর। দিনের পর দিন সুজিত সরকার ঘুমোতে দেননি নায়ককে। বিনা তর্কে মেনে নিয়েছেন সে যন্ত্রণা। যন্ত্রণার এই অনলে পুড়ে সোনার মতো এ ছবিতে ঝলসে উঠেছেন বরুণ। সম্ভবত এখনও পর্যন্ত তাঁর জীবনের সেরা পারফরম্যান্স।
নবাগতা হিসেবে কোনও গ্ল্যামারাস রোল বাছতেই পারতেন বণিতা সান্ধু। তবে এমন একটা চরিত্র, যার সারা ছবিতে হাতে গোনা কয়েকটি সংলাপ রয়েছে। আর পুরো অভিনয় মুখের অভিব্যক্তির মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে হবে। তা করতে সত্যি এলেম লাগে। বর্তমান অভিনেত্রীদের কুর্নিশ জানাতে ইচ্ছে করে। নায়িকা হওয়ার তাগিদ ছেড়ে অভিনেত্রী হয়ে উঠেছেন তাঁরা। হয়েছেন ব্যতিক্রমী। বণিতার মায়ের চরিত্রে গীতাঞ্জলি রাওয়ের অভিনয় একেবারে মেদহীন। কোন চরিত্রে কতটা প্রাণের প্রয়োজন থিয়েটার শিল্পীদের তা বোধহয় নখদর্পণে থাকে।
জুহি চতুর্বেদী লিখেছেন মন কাড়া হাসি বেদনার শব্দ, কথা। আজকের বলিউড ছবির সংলাপ হয়ে ওঠে এ রকম— বরুণ তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষকে (প্লিজ, প্রেমিকা পড়বেন না) বলে, “অনেক জায়গায় তো বেড়াতে যাবে ভেবেছিলে? কোনও দিন ভাবতে পেরেছিলে কোমায় যাবে?’’ মারাত্মক মানসিক টানাপড়েনে মানুষ খুব সহজ কথা বলে ওঠে। জুহি সেই জায়গায় সুজিতের কাজ সহজ করলেন। কিন্তু যাঁর কাছে এই প্রশ্ন সে নিরুত্তর! আকস্মিক এক কালো ঝড় তাঁর বাঁচার স্বাভাবিকতা ফুরিয়ে দিয়েছে। শিউলি ফোটা প্রায় শেষ, তখন শীতের ধূসরতা গ্রাস করছে সুজিতের অক্টোবরের ক্যানভাস!
ছবিতে গান নেই। কিন্তু সুর বাঁধা মন্দ্রকে। নিখাদে। সপ্তকে। ছবির আবহেও নৈঃশব্দের চেতনা। আর সেই চেতনার নাম শান্তনু মৈত্র। বিষাদের অশ্রজলে এমন নরম অডিয়োগ্রাফি বহু দিন পর হিন্দি ছবিতে। তাই দীপঙ্কর জোজো চাকী, বিশ্বদীপ চট্টোপাধ্যায়,  নীহাররঞ্জন সামালকে ধন্যবাদ।
এ ছবির আলোচনা করা যায়। সমালোচনা নয়। কারণ, এ ছবি সম্পর্ককে নতুন করে দর্শকদের সামনে এনে বলে, দুই মানুষের মনের সুতোয় হিসেব চলে না। কাছের পর্দা আড়াল করলেও মনের দরজার সবচেয়ে গভীরে তারা বড় কাছাকাছি। তাই ছবির শেষে দর্শক বাকরুদ্ধ নিশ্চুপ হয়ে যায়, ছবি শেষ হলেও তার রেশ মনের মণিকোঠায় সমস্ত অনুভূতিকে আচ্ছন্ন করে রাখে।
 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here