স্বাস্থ্য, অসুখ, পরিষেবা ও ডাক্তারদের মুষ্টিযোগের কাহিনী

1
1333
ফাইল ছবি

ডাঃ জয়ন্ত ভট্টাচার্য

বেশ কিছুদিন আগে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল-এ অমর্ত্য সেন একটি আমন্ত্রিত প্রবন্ধ লিখেছিলেন “Health: perception versus observation” শিরোনামে (ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল, ১৩ এপ্রিল, ২০০২, পৃঃ ৮৬০-৮৬১)। সেখানে রোগীর নিজের রোগ সম্পর্কে বোধ বা “internal view” এবং রোগ ও রোগী সম্পর্ক ডাক্তার বা প্যাথোলজিস্ট-এর মতামত বা “external view”  এই দুয়ের মাঝে টানাপোড়েন ও সমন্বয়ের প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তাঁর জোর ছিল স্বাস্থ্যনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ দুয়ের মাঝে সামঞ্জস্য আনতে হবে। বিহারের উদাহরণ দিয়ে, যেখানে অর্থনীতি ও শিক্ষার হার অনেক নীচে, প্রবন্ধে দেখানো হয়েছিল যে সেখানে “self reported morbidity” বা রোগীর নিজের রোগ সম্পর্কে তথ্য জানানোর হার অনেক কম। অথচ শিক্ষার হারে ভারতের সবচেয়ে অগ্রণী রাষ্ট্র কেরালাতে “self reported morbidity”-র হার অনেক বেশি।  পাঠক হিসেবে আমাদের বুঝতে অসুবিধে হবার কথা নয় স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা বা পরিষেবা, পরিষেবা নেবার জন্য রোগীদের আগ্রহ ও বাস্তব অবস্থা, যথেষ্ট মাত্রায় পরিষেবা পৌঁছনোর বাহক ব্যবস্থাগুলো সবকিছু একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে আছে। ইংরেজিতে বললে concatenated। অর্থাৎ, স্বাস্থ্য একটি সদা-গতিশীল বিষয় যা পারিপার্শ্বিক সামাজিক অবস্থা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং অর্থনীতিকে যেভাবে দেখা হয় সে বিষয়টি, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান ও সর্বোপরি মানুষ বা নাগরিকের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবনধারণের ব্যবস্থা নিয়ে রাষ্ট্র কি অবস্থান নেয় এ সমস্ত কিছুর ওপরেই নির্ভর করে।

পাবলিক হেলথ-এর আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক মাইকেল মার্মট বলছেন, “দুঃখজনকভাবে গরীব দেশগুলোতে মানুষ অপ্রয়োজনীয়ভাবে মারা যায়। আবার ধনী দেশগুলোতেও যারা সামাজিক সুযোগ সুবিধের ক্ষেত্রে প্রান্তিক তাদের মাঝে মৃত্যুহার বেশি।” (“হেলথ ইন অ্যান আনইকুয়াল ওয়ার্ল্ড”, ল্যান্সেট, ৩৬৮, ২০০৯, পৃঃ ২০১৮) অন্যত্র বলছেন, “যদি কোন জনসমষ্টির স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে এটা বোঝাবে যে set of social arrangements পরিবর্তন করতে হবে।” (“সোশ্যাল ডিটারমিনেন্টস অফ হেলথ ইনিকুয়ালিটিস”, ল্যানসেট, ৩৬৫, ২০০৫, পৃঃ ১০৯৯) প্রায় একইধরণের কথা এসেছে ড্রাফট ন্যাশনাল হেলথ পলিসি (২০১৫)-তে। বলা হয়েছে ভারতের জিডিপি-র বৃদ্ধি সত্ত্বেও দেশের হেলথ ইক্যুইটির কোন পরিবর্তন হয় নি (1.1, 2.1-4)।

স্বাস্থ্য নিয়ে হালের এসব আরেকটু ভাল করে বুঝতে হলে আমাদের একবার ইতিহাসের পেছন দিকে যাবার প্রয়োজন। উল্লেখযোগ্য যে ১৯৪৫ পর্যন্ত স্বাস্থ্য ছিলো একটি “ভুলে যাওয়া” বিষয় –health was “forgotten” when the Covenant of the League of Nations was drafted after the first World War. Only at the last moment was world health brought in, producing the Health Section of the League of the Nations, one of the forerunners of the present FAO, as well as WHO. (K. Evang, “Political, national and traditional limitations to health control”, Health of Mankind, 1967, pp. 196-211) ইভাং-এর বয়ানে – কে ভেবেছিলো যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যখন রাষ্ট্রপুঞ্জের চার্টার তৈরি হচ্ছে তখন স্বাস্থ্য আবার “forgotten” হয়ে যাবে? ঠিক এটাই ঘটেছিলো যখন ১৯৪৫-এর বসন্তে সান ফ্রান্সিসকোতে “জরুরী ভিত্তিতে” বিশ্ব স্বাস্থ্য-কে আলোচ্য তালিকায় আনা হয়। তিন জন মানুষ সেদিন উদ্যোগ নিয়েছিলেন – ব্রাজিলের তরফে ডাক্তার Paula Souza, চীনের তরফে ডাক্তার Szeming Sze এবং নরওয়ের তরফে ডাক্তার ইভাং স্বয়ং।

স্বাস্থ্যের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বারেবারে ভুলে যাওয়া হচ্ছিলো কেন? সম্ভবত বাণিজ্য হিসেবে স্বাস্থ্য কি পরিমাণ মুনাফা দিতে পারে তা তখনো অব্দি বহুজাতিক কোম্পানী এবং ইউরো-আমেরিকার দেশগুলোর মাথায় বা নজরে আসে নি । উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০০৬ সালের হিসেব অনুযায়ী (যে অব্দি যথেষ্ট গবেষণালব্ধ তথ্য পাওয়া যায়) ভারত হেলথ কেয়ার এবং আনুষঙ্গিক উপাদান বিক্রীর অন্যতম দ্রুত-বর্ধনশীল বাজার। ওষুধপত্রের বিক্রি ১৭.৩% হারে বেড়ে হয়েছে ১৭.৩ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিকভাবে এ বাজার ১.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের, ২০১৭-তে এসে এর পরিমাণ আরো বাড়বে অবশ্যই (IMS Health White Paper, 2016)। WHO বা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার একটি রিপোর্ট অনুযায়ী যুক্তিসম্মত চিকিৎসা এবং মুনাফার মাঝে সবসময়েই রয়েছে “an inherent conflict of interest between the legitimate business goals of manufacturers and the social, medical and economic needs of providers and the public to select and use drugs in the most rational way”

(WHO, Clinical Pharmacological Evaluation of Drug Control, 1993)। বর্তমানে সমস্ত দানবাকৃতি বহুজাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীগুলো তাদের মুনাফার ১/৩ অংশ খরচ করে ওষুধ-নামক পণ্যকে বাজারে ভালোভাবে বিক্রয়যোগ্য করে তোলার জন্য। কিন্তু রিসার্চ এবং ডেভেলপমেন্টের জন্য এর ঠিক অর্ধেক খরচ করে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ২০১০ সালের রিপোরট অনুযায়ী হেলথকেয়ার ইনডাস্ট্রির মুনাফার সম্মিলিত পরিমাণ ৫.৩ ট্রিলিয়ন ডলার (WHO, World Health Report, 2010), ২০১৭-তে আরো অনেক বেড়েছে নিশ্চয়ই, যদিও সঠিক তথ্য এই মুহূর্তে আমাদের হাতে নেই।

২০০৫ সালে প্রযুক্তি-নির্ভর মেডিসিনের চাপে পড়ে ব্রাজিলকে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। অধুনা গবেষকেরা দেখিয়েছেন, আফ্রিকার যে দেশগুলোতে এবোলা এরকম মারনান্তক চেহারা নিল সে দেশগুলো IMF এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর চাপে জনস্বাস্থ্যখাতে খরচা কমিয়ে প্রযুক্তি নির্ভর (যেখানে সিটি স্ক্যানার বা MRI কিনতে হয় বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে) স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়তে বাধ্য হয়েছে। পরিণতিতে এবোলা যখন মহামারির চেহারা নিয়েছে তার সাথে মোকাবিলা করার মতো পরিকাঠামো এ দেশগুলো হারিয়ে ফেলেছে। (রবিনসন ও ফাইফার – “The IMF’s Role in the Ebola Outbreak – The Long-Term Consequences of Structural Adjustment,” Bretton Woods Project, ২০১৫)

১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ ও বিপুল মুনাফার ধারণা সুস্পষ্ট হয়। সাথে সাথে বদলাতে শুরু করে ১৯৪৫ সাল অব্দি “forgotten” বিষয়টির চরিত্র। এক নতুন যাত্রাপথ জন্ম নেয় – ১৯৭৮ সালের আলমা আটা সম্মেলনের “২০০০ সালের মধ্যে সকলের জন্য স্বাস্থ্য” এবং “সংহত প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা”-র (comprehensive primary health care) বোধ থেকে ২০১৫-তে এসে অতিমাত্রায় বিক্রয়যোগ্য “স্বাস্থ্য পরিষেবা”-র পণ্য বাজারে রূপান্তর।

এখানে তিনটে গুরুতর বিষয় আমাদের বিবেচনা করতে হবে – (১) “সকলের জন্য স্বাস্থ্য”-র শ্লোগান কি করে মুক্ত বাজারের অর্থনীতির আওতায় চলে এলো; (২) প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবার সংহত ধারণা কিভাবে বেছে নেওয়া (selective) স্বাস্থ্য পরিষেবার ধারণাতে রূপান্তরিত হল, যার ফলে ঝাঁ চকচকে অত্যন্ত দামী পাঁচতারা হাসপাতাল বা নার্সিং হোম “ভালো স্বাস্থ্য”-র সমার্থক হয়ে উঠলো; এবং (৩) ক্লিনিক্যাল হেলথ বা ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ও এর চিকিৎসা এবং পাবলিক হেলথ বা জনস্বাস্থ্যের মধ্যেকার মৌলিক পার্থক্য মুছে গিয়ে সমার্থক হয়ে উঠলো। একইসাথে মেডিক্যাল শিক্ষাক্রমের ক্রম-রূপান্তর সমগ্র প্রক্রিয়াটিকে ত্বরাণ্বিত করে এ পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল।

১৯৬০-৭০এর দশকে এশিয়া, আফ্রিকা আর লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর একটা বড় অংশ ধীরে ধীরে উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এ দেশগুলোকে যেমন মানব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে; তেমনি, যুদ্ধ-দারিদ্র্য-বুভুক্ষা-দীর্ণ অগণন মানুষের কাছে স্বাস্থ্যের ন্যূনতম সুযোগ পৌঁছে দিতে হবে। ১৯৬৭ সালের একটি গবেষণা দেখালো, অনেকগুলো উন্নয়নশীল দেশ তাদের দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যের সমস্যাকে নিজেদের মতো করে সমাধান করছে যেমন চিনের barefoot doctors (Amor Benyoussef, Barbara Christian, “Health care in developing countries”, Social Science and Medicine 1967, 11: 399-408)। তানজানিয়া, কিউবা, ভেনেজুয়েলা এবং নাইজেরিয়াতে প্রায় একইরকম পদ্ধতি ফলপ্রসূ হয়ছে। পৃথিবীতে সূচনা হল প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধারণার। ১৯৬০-এর দশকের শুরু থেকেই মেক্সিকোতে ডেভিড ওয়ার্নার-এর (Where There Is No Doctor-এর লেখক) উদ্যোগে তৃণমূল স্তরে গ্রামের সাধারণ মানুষকে সামিল ও প্রশিক্ষিত করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকে সুরক্ষিত করার উদ্যোগ শুরু হয়েছিল। লাতিন আমেরিকার অনেকগুলো দেশেই ওয়ার্নারের প্রভাবে জনস্বাস্থ্য আন্দোলন পরিব্যাপ্ত হয়েছিল। ডেভিড ওয়ার্নার যখন পশ্চিম মেক্সিকোতে স্থানীয় সম্পদ ও জনতাকে ব্যবহার করে স্বাস্থ্যের বোধ ও আন্দোলন গড়ে তুলছেন তখন তাঁকে সম্মিলিত ল্যান্ড ব্যাংক-ও গড়ে তুলতে হচ্ছে দারিদ্র্যের মাত্রা হ্রাস করার জন্য। সেসময়ে তাঁর স্বাস্থ্য আন্দোলনের বৃহৎ প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছিলো নাফটা বা North American Free Trade Agreement। নাফটা মেক্সিকো সরকারকে চাপ দিয়েছে যাতে আমেরিকার বীজ ও প্রযুক্তি অবাধে ব্যবহার করা যায়। এ ঘটনা ঘটাতে পারলে জমি ব্যাংক উঠে যাবে, কৃষক আবার ঋণের জালে জড়াবে, প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অস্তিত্বও থাকবে না। সাম্প্রতিক সময়ের একটি প্রবন্ধে মন্তব্য করা হয়েছে যে আমেরিকা ইরাকে যুদ্ধের জন্য ১০০ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে প্রস্তুত, কিন্তু এইডস, যক্ষা এবং ম্যালেরিয়ার মোকাবিলার জন্য তৈরী Global Fund-এ মাত্র ১০০ মিলিয়ন ডলার দেয়। (John H Hall, Richard Taylor, “Health for all beyond 2000: the demise of the Alma-Ata Declaration and primary health care in developing countries”, Medical Journal of Australia 178 (2003): 17-20)

একেবারে হালে পৃথিবীর চিকিৎসক মহলে সর্বাধিক পঠিত নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন (NEJM)-এ মন্তব্য করা হয়েছে যে আমেরিকা থেকে আগত একজন পর্যটকের কাছে কিউবা “অবাস্তব” এবং “মাথা ঘুরিয়ে দেবার মনে হয়” – “কিউবার স্বাস্থ্য পরিষেবার বিষয়টি কেমন অবাস্তব বলে মনে হয়। প্রত্যেকের একজন করে পারিবারিক চিকিৎসক আছে। সমস্ত কিছু বিনামূল্যে – কোন ইন্সিউরেন্স কোম্পানির আগাম অনুমোদন ছাড়াই। সমস্ত ব্যবস্থাটি মনে হয় আপাদ-মস্তক উল্টে আছে। সমগ্র ব্যবস্থা সুশৃঙ্খলভাবে সংগঠিত, এবং প্রাথমিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রিভেনশন-এর ওপরে। যদিও কিউবার অর্থনৈ্তিক সামর্থ্য নিতান্ত সীমিত, এর স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থা এমন কিছু সমস্যার সমাধান করেছে যা আমাদের ব্যবস্থা এখনো নজর করে উঠতে পারেনি।” (Edward Campion and Stephen Morrissey, “A Different Model – Medical Care in Cuba”, NEJM 2013, 368(4): 297-299)

মোদ্দা বিষয় হল, ১৯৭০ থেকে ১৯৭৮-এর মধ্যে পৃথীবির বিভিন্ন দেশে জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের বিভিন্ন রূপ তৈরি হতে থাকে। এসময়ে WHO-র ওপরে চাপ আসতে থাকে তৃণমূল স্তরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে প্রসারিত করা এবং রোগের ক্ষেত্রে সামাজিক ভূমিকার ব্যাপারে আরো বেশী সক্রিয় হবার জন্য। যদিও সোভিয়েট রাশিয়া ১৯৪৯-১৯৫৭ পর্যন্ত সময়ে হু-র সদস্য ছিলো না কিন্তু হু-র বাৎসরিক বাজেটের ৬% যোগাত এ দেশটি। ১৯৫৯ সালে সদস্য হবার পরে এর পরিমাণ বেড়ে হয় ১৩%। (Anne-Emmanuel Birn, “The stages of international (global) health: Histories of success or successes of history?”, Global Public Health 2009, 4(1): 50-68)

১৯৭৮-এর সনদে উচ্চারিত হয়েছিলো – “A genuine policy of independence, peace, détente and disarmament could and should release additional resources that could well be devoted to peaceful aims and in particular to the acceleration of social and economic development of which primary health care, as an essential part, should be allotted its proper share.” এ বক্তব্য থেকে পরিষ্কার যে যুদ্ধখাতে ব্যয়বরাদ্দ স্বাস্থ্যকে সঙ্কুচিত করে এবং প্রথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কার্যকরী করতে হলে শান্তির জন্য প্রচেষ্টাও একটি অর্থপূর্ণ পদক্ষেপ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, যুদ্ধখাতে ব্যয়-বরাদ্দ কমিয়ে জনকল্যাণমূলক ক্ষেত্রে ব্যয় বাড়ানোর মতো ঘোরতর রাজনৈতিক বার্তাও ছিলো এ ঘোষণাপত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট।

মুশকিল হচ্ছে তেলের এবং খনিজ সম্পদের বাজারের জন্য সমগ্র পশ্চিম এশিয়া ও মিশর অশান্ত হয়ে না উঠলে যুদ্ধাস্ত্র বিক্রীর বিপুল মুনাফা হয় না। স্বাস্থ্য এখানে অবান্তর! এজন্য ১৯৭৮-এর সনদপত্র মুক্ত বাজারের প্রবক্তাদের পক্ষে হজম করা অসম্ভব একটি ঘটনা। ২০১৫ সালে ফরচুন পত্রিকার সমীক্ষা অনুযায়ী সবচেয়ে লাভজনক প্রথম ১০টি লগ্নীর মধ্যে চিকিৎসা পরিষেবার অবস্থান।

ফলে এ প্রবণতাকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিহত করার জন্য যুগপৎ আরেকটি শক্তিশালী কার্যক্রম গড়ে উঠলো।

পণ্য দুনিয়ার আরেক ইতিহাস

১৯৭৭ সালে Alain Enthoven মুক্ত বাজারের উপযোগী Consumer Choice Health Plan (“এ ন্যাশনাল হেলথ ইন্সিউরেন্স প্রোপোজাল বেসড অন রেগুলেটেড কমপিটিসন ইন দ্য প্রাইভেট সেক্টর”) তৈরি করলেন। আমেরিকার কার্টার প্রশাসন এটাকে অনুমোদন করলো। NEJM-এ ১৯৭৮ সালের মার্চ মাসে “Consumer Choice Health Plan” শিরোনামে দুটো কিস্তিতে প্রকাশিত হল এ লেখা। ১৯৭৯-এর ২৭শে ডিসেম্বর Wall Street Journal-এ প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ বিশ্লেষণ করে দেখালো যে হেলথ কেয়ার করপোরেশনগুলোর নীট আয় ১৯৭৯ সালে ৩০-৩৫% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ১৯৮০ সালে আরো ২০-২৫% আয় বৃদ্ধি প্রত্যাশিত। NEJM-এর প্রাক্তন সম্পাদক রেলম্যান এক প্রবন্ধে জানালেন – ১৯৭৯ সালে কেবলমাত্র বিভিন্ন ধরনের ডাক্তারি পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যয়িত অর্থের পরিমাণ ১৫ বিলিয়ন ডলার এবং যৌগিক পদ্ধতিতে প্রতি বছরে শতকরা ১৫ ভাগ হারে বাড়বে, উপরন্তু আমেরিকানরা ব্যক্তিগত উদ্যোগ, মালিকনা এবং মুনাফার তাগিদে বিশ্বাস করে। (Arnold Relman, “The New Medical-Industrial Complex,” NEJM 1980, 303(17): 963-970)

প্রসঙ্গত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে পারমাণবিক বিস্ফোরণের প্রয়োজনে বিপুল অর্থের বিনিয়োগে নতুন নতুন প্রযুক্তির জন্ম হয়েছিলো (যার ফলিত চেহারা সিটি স্ক্যানার, এম আর আই ইত্যাদি)। যুদ্ধোত্তর সময়ে এই বিনিয়োগের দীর্ঘকালীন মুনাফা ধরে রাখার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে এ সমস্ত প্রযুক্তি রফতানি নিতান্ত জরুরী হয়ে পড়লো। উচ্চ প্রযুক্তি-নির্ভর চিকিৎসা (যেমন ক্যানসার ও হার্টের অসুখ) এক্ষত্রে সবচেয়ে সফল ও কার্যকরী অবস্থা তৈরি করে। অসুস্থ মানুষ মেডিসিনের ও চিকিৎসকের ওপরে নির্ভর করবেই এবং সমগ্র চিকিৎসা ব্যবস্থাকে যদি প্রযুক্তি নির্ভর করে তোলা যায় তাহলে অসুস্থতা থেকে নিংড়ে নেওয়া মুনাফা নিয়ে দুশ্চিন্তা কমে যায়। এর পূর্বশর্ত দুটি – (১) চিকিৎসাকে মুক্ত বাজারের অর্থনীতির আওতায় আনতে হবে এবং সাধারণ জনসমাজকে এই অর্থনৈতিক দর্শনে বিশ্বাসী করে তুলতে হবে, (২) স্বাস্থ্য-র এবং “সংহত প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা”-র ধারণাকে স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং selective primary health care-এর ধারণা দিয়ে প্রতিস্থাপিত করতে হবে। একই সাথে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বাস্থ্য পরিষেবাকে পূর্ণত মুক্তও করে ফেলতে হবে। গবেষকেরা দেখিয়েছেন কিভাবে ১৯৭০ পরবর্তী সময়ে নয়া-উদারবাদী স্বাস্থ্যনীতি “have shifted resources from the public to the private sector, reduced benefits to recipients, and affected the lives of clients and workers alike.” (Mimi Abramovitz, Jennifer Zelnick, “Double Jeopardy: the impact of neoliberalism on care workers in the United States and South Africa”, International Journal of Health Services 2010, 40 (1): 97-117)

“Selective Primary Health Care” শিরোনামে প্রথম লেখা প্রকাশিত হল নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ ১৯৭৯ সালের নভেম্বর মাসে। প্রাথমিকভাবে আলমা-আটা কনফারেন্স-এর প্রতিধ্বনির মতো কিন্তু ভিন্ন যুক্তিক্রম দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হল এর যাথার্থ্য। লেখার শুরুতে জানানো হল পৃথিবীর অনুন্নত বিশ্বের ৩০০ কোটি মানুষ “suffer from a plethora of infectious diseases.” ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারা-কে উদ্ধৃত করে বলা হল – যে যুগে আমরা ক্রম-হ্রাসমান সম্পদ পাচ্ছি তখন কিভাবে যারা নীচের দিকে আটকা পড়ে আছে তাদের জন্য ২০০০ সালের মধ্যে স্বাস্থ্য ও ভালো-থাকা-কে সুনিশ্চিত করতে পারি? (Julia A. Walsh and Kenneth S. Warren, “Selective Primary Health Care: An Interim Strategy for Disease Control in Developing Countries,” NEJM 1979, 301(18): 967-974)

পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালে ডেভিড প্রাইস দেখিয়েছেন “How the World Trade Organization is shaping domestic policies in health care”। (Lancet 354 (1999): 1889-92)। এসব কিছুই ১৯৭৮-এর সম্মেলনের বিপরীতে ও বৃহৎ ওষুধ কোম্পানী এবং আমেরিকার উপযোগী মুক্ত নয়া-উদারবাদী বাজারের অর্থনীতির স্বপক্ষে। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ Hayek-এর পুস্তক The Constitution of Liberty (1960, pp. 298-299) স্বাস্থ্যেকে বাজারের হাতে তুলে দেবার গোড়াপত্তন করেছিলো। শুরু হয়েছিলো বিশ্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থার রূপান্তর। জন্ম নিল অসুস্থতা ফেরী করা বা “disease mongering”-এর বিশ্বব্যাপী জাল বিস্তারের সফল, সূক্ষ্ম ও বিপজ্জনক কার্যক্রম। (Ray Moynihan, Allan Cassels, Selling Sickness: How Drug Companies Are Turning Us All Into Patients, 2005)

রেলম্যান বলেছিলেন যে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রাথমিক নীতি হবে “এমন এক নীতি যা দামের বিনিময়ে নির্ধারিত মুক্ত বাজারের শক্তিকে শক্তিশালী করবে”। (“The Allocation of Medical Resources”, Journal of Medical Education 1979, 55: 99-104)। অস্যার্থ, যা ছিল রাষ্ট্রের হাতে তাকে তুলে দিতে হবে মুক্ত বাজারের শক্তির হাতে। রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হবার বদলে (যেমন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ বা আলমা আটা-র ঘোষণায় বলা হয়েছিল) স্বাস্থ্য চলে যাবে বাজারের হাতে। এবং মুক্ত অর্থনীতি ও বাজার যা কেনা-বেচা করবে তা “স্বাস্থ্য পরিষেবা”, স্বাস্থ্য নয়। “স্বাস্থ্য” পর্যবসিত ও রূপান্তরিত হল “স্বাস্থ্য পরিষেবা”-তে। হারিয়ে যেতে থাকলো সংহত প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবার ধারণা।

সর্বাগ্রে UNICEF “সিলেকটিভ প্রাইমারী হেলথ কেয়ার”-এর ধারণা গ্রহণ করে এবং GOBI (Growth monitoring, Oral re-hydration Solution, Breast-feeding and Immunization) প্রকল্প গ্রহণ করে। এ বিষয়ে ফ্রান বম-এর গবেষণা পত্র উল্লেখযোগ্য – “Health for All Now! Reviving the spirit of Alma Ata in the twenty-first century: An Introduction to the Alma Ata Declaration” (Social Medicine 2007, 2: 34-41)

এছাড়াও, স্বাস্থ্য পরিষেবার মজা হচ্ছে যে যত পুঁজি বিনিয়োগ করতে পারবে সে বিনিয়োগকারীর সার্ভিস ততো লোভনীয় ও আকর্ষণীয় হবে। এমন কি সাধারণ মধ্যবিত্ত, মায় দরিদ্র মানুষ পর্যন্ত ঘটি-বাটি বন্ধক রেখে এই সার্ভিস পাঁচতারা ঝাঁ-চকচকে প্রাইভেট হাসপাতাল থেকে কিনবে। আর পাঁচটা পণ্যের মতো চিকিৎসা-তুল্য বিষয় হয়ে ওঠে কেনাবেচার সামগ্রী আর রোগী হয়ে যায় consumer বা ভোক্তা। ভারতের প্রসঙ্গে একেবারে হালে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল-এ মন্তব্য করা হল – যত বেশি করে রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শুকিয়ে যেতে ও হ্রাস পেতে থাকলো তত বেশি করে প্রাইভেট সেক্টর সক্রিয় ও কার্যকরী হয়ে উঠলো (K. Srinath Reddy, “India’s Aspirations for Universal Health Coverage”,  NEJM 2015, 371 (1): 1-5)

বর্তমানে প্রাইভেট সেক্টর ইন-ডোর রোগীর ৮০% এবং আউটডোর রোগীর ৬০%-এর পরিষেবা দেয়। স্বাস্থ্যখাতে ৭০% ভাগ খরচ নিজেদের পকেট থেকে মেটাতে হয়, মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ে, এক নতুন শব্দবন্ধ তৈরি হয় “মেডিক্যাল পভার্টি ট্র্যাপ”। ভারতের National Health Policy 2015 draft থেকে আমরা জানতে পারি স্বাস্থ্যপরিষেবার (স্বাস্থ্য নয়, মনে রাখতে হবে) মূল্য চোকাতে গিয়ে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি মানুষ দরিদ্র হয়ে যায় বা দারিদ্র্যসীমার নীচে চলে যায় (পৃঃ ৮)। প্রাইভেট সেক্টর হাসপাতালের রমরমার জন্য ২০১১-১৫ সালের হিসেব অনুযায়ী ভারতের মোট পরিবারের প্রায় ১৮% “catastrophic expenditures” বহন করতে বাধ্য হয় (২০০৪-২০০৫-এ এ সংখ্যা ছিল ১৫%)। অথচ ভারত এ মুহূর্তে গড় জাতীয় আয়ের নিরিখে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। উল্লেখযোগ্য হল, ভারতের মোট জিডিপি-র মাত্র ১.৪% খরচ করা হয় স্বাস্থ্যখাতে। এই অংক থাইল্যান্ড, শ্রীলংকার মতো ছোট দেশের থেকেও কম। আবার স্বাস্থ্যের জন্য একটাকা বরাদ্দ হলে শেষ অব্দি রোগীর কাছে পৌছয় ১০-১৫ পয়সা। বাকীটা প্রশাসনিক খাতে এবং মাইনে দিতে খরচ হয়।

রাষ্ট্রহীন মানুষেরা যাদের মধ্যে উদ্বাস্তু বা শরণার্থী, প্রমাণপত্রহীন পরিযায়ী মানুষ অথবা যাদের জন্মের নথিভূক্তি অস্বীকার করা হয়েছে, এদেরকে রাষ্ট্রের সর্বশক্তিমান কর্তাব্যক্তিরা “without legal entitlement to any rights to health care” বলে মনে করেন। (“What does universal health coverage mean?”, Lancet January 18, 2014, pp. 277-279) এই মুহূর্তের বিশ্বে রোহিংগা শরণার্থীদের কথা ভাবুন একবার । মানুষ হিসেবে এরা বেঁচে আছে অথচ স্বাস্থ্যের অধিকার নেই! এ এক বিচিত্র ছলনা – কে নেবে এ সমাধানের দায়িত্ব ?

আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেখে নেওয়া যাক। ১৯৯৯-২০০০ সালের মধ্যে AIIMS-এর মতো প্রতিষ্ঠানের ৫৪% ছাত্র পাড়ি দিয়েছে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোতে (“High-end physician migration from India, Bulletin of the World Health Organization 86 (2008): 40-45)। ২০০৬-এর অথ্যানুযায়ী, ভারতের মোট মেডিক্যাল স্নাতকের (৫৯২,২১৫) ১০.১% বা ৫৯,০৯৫ জন বিদেশে চলে গিয়েছে (Fitzhugh Mullan, “Doctors For the World: Indian Physician Emigration,” Health Affairs 25.3 (2006): 380-393)। প্রায় ৬০,০০০ ডাক্তার যারা বিদেশে পসার করেছে তাদের ৪০, ৮৩৮ জন আছে আমেরিকায় (আমেরিকার মোট চিকিৎসকের ৪.৯%), ১৫,০৯৩ জন ইংল্যান্ড-এ (মোট চিকিৎসকের ১০.৯%), ২,১৪৩ জন অস্ট্রেলিয়াতে (মোট চিকিৎসকের ৪.০%) এবং ১,৪৪৯ জন কনাডাতে (মোট চিকিৎসকের ২.১%)। [Fitzhugh Mullan, “The Metrics of the Physician Brain Drain,” NEJM October 27, 2005: 1810-1817] এ সমস্ত চিকিৎসকেরা কি ভূমিকা পালন করেন। সব দেশের তথ্য না পাওয়া গেলেও আমেরিকার পরিসংখ্যান বলে আমেরিকার গ্রামাঞ্চলের দিকে যেসব CAH (Critical Access Hospital) আছে সেখানকার প্রতি ৪ জন চিকিৎসকের ১ জন (২৫%) হচ্ছে আমেরিকান নয় এমন, এদের মধ্যে ৬১% হচ্ছে ভারতীয় (“The role of international medical graduates in America’s small critical access hospitals,” Journal of Rural Health 20.1 (2004): 52-58)।

এজন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বিদেশীদের অভিবাসনের ওপরে নিষধাজ্ঞা আরোপ করেন তখন নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ লেখা হয় “International Exchange and American Medicine”-এর মতো প্রতিবেদন। বলা হয় – “International medical graduates fill access gaps in underserved communities, including rural and Native American communities, as well as caring for American veterans in the Veterans Health Administration system” এবং এরকম একটি পশ্চাদমুখী পদক্ষেপ “will harm our patients, colleagues, and America’s position as a world leader in health care and innovation” (NEJM February 1, 2017: pp. 1-2)

মেডিক্যাল শিক্ষার দু-চার কথা

ক্লিনিকে বা হাসপাতালে (সরকারি/বেসরকারি) একক ব্যক্তি বা রোগীর চিকিৎসা, যাকে বলা যায় ক্লিনিক্যাল হেলথ। ২০০৬ সালে দেখা যাচ্ছে – Clinical teachers have been under intensifying pressure to increase their clinical productivity – that is, to generate revenues by providing care for paying patients. (“American Medical Education 100 Years after the Flexner Report”, NEJM 355 (2006): 1339-44) অর্থাৎ, মেডিক্যাল শিক্ষাক্রমে কাঞ্চনমূল্যের প্রসঙ্গটি অতিমাত্রায় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে – যদি “revenue” তৈরি করতে পারে তাহলে শিক্ষকের গুরুত্ব বাড়বে, নাহলে গুরুত্বহীন। ২০১১ সালে এসে আমেরিকায় মেডিক্যাল শিক্ষার বর্তমান চেহারা নিয়ে মন্তব্য করা হল, এটা নিয়তির পরিহাসের মতো যখন মেডিক্যাল কলেজের প্রথম বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীলতা শেখার কথা সে সময়ে ছাত্রেরা “begin to lose empathy.” (“Into the Waters – Clinical Clerkships”, NEJM 364: 1190-92)

কখন ঘটে এই সহৃদয়তার স্খলন? [T]he first three years of medical education significantly decreased students’ vicarious empathy. (“Is There Hardening of the Heart during Medical School?” Academic Medicine 83 (2008): 244-289) অন্যত্র, মেডিসিনের ট্রেইনিং-এ বর্তমান মূল লক্ষ্য হল রোগ ডায়াগনোসিস করা, রোগীর সামাজিক অবস্থান, চাহিদা বা সক্ষমতাকে বোঝা নয়। (“Patient- and Family-Centered Medical Education: The Next Revolution in Medical Education?”, Annals of Internal Medicine 2014, 161 (1): 73-75)

প্রশ্ন ওঠে – “Are We Living in a Medical Education Bubble Market?,” (NEJM 2013, 364: 300-301) এ প্রবন্ধে লেখকেরা জানিয়েছেন যে মেডিক্যাল শিক্ষার্থীরা যে দামে শিক্ষা কেনে তার চাইতে বেশি দামে বিক্রী করে। বাজার অর্থনীতির চরম প্রভাবে “we will march down the debt-to-income-ratio ladder, through psychiatrists to cardiologists to orthopedists . . . until no one is left but the MBAs.”

একেবারে হালে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল-এ এরকম আর্ত অবস্থার – primary care, the backbone of the nation’s health system, is at grave risk of collapse – প্রতিফলন ঘটছে “Primary Care – Will It Survive?” শিরোনামের প্রবন্ধে। মেধাবী, আর্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন চোখে নিয়ে যে ছাত্র সমাজ মেডিক্যাল শিক্ষার জগতে প্রবেশ করে তারা ক্রমাগত এই অ-মানবিক শিক্ষাক্রম আর বাজারী হিংস্র অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার বুদ্বুদের বাজারের মধ্য দিয়ে সুদীর্ঘ যাত্রা করে একজন পরিশীলিত ব্যবসায়িক চিকিৎসা-পরিষেবা বিক্রেতা হয়ে ওঠে। এ ট্র্যাজেডি কার? ছাত্রদের? সমাজের? চিকিৎসকের? রাষ্ট্রের? নাকি সম্মিলিতভাবে সবার?

ভারতের খসড়া জাতীয় স্বাস্থ্যনীতিতে (২০১৫)-তে ৪০ বছর আগেকার comprehensive primary healthcare-এর প্রসঙ্গ আবার তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে – This is in line with the emergent international “Health In All” approach as complement to “Health For All. (p. 16, 4.2.1) বলা হচ্ছে – Assure universal availability of free, comprehensive primary health care services, as an entitlement, for all aspects of reproductive, maternal, child and adolescent health and for the most prevalent communicable and non-communicable diseases in the population. (p. 14, 3.3.3)

বাস্তবে এগুলোতো সব শুভ-ইচ্ছা বা pious wish, সেই ১৯৪৬ সাল থেকে ভোর (Bhore) কমিটি যবে তৈরী হয়েছিল সেসময় থেকে একথাগুলোই বারেবারে উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু জাতীয় স্বাস্থা-কাঠামো রয়েছে ডাক্তার-কেন্দ্রিক, কেন্দ্রাভিমুখী। এজন্য সিভিল সোসাইটির মতামত স্বাস্থ্যনীতি রচনার ক্ষেত্রে কখনো গুরুত্ব পায়নি। ল্যানসেট-এর একটি সমীক্ষা দেখায় এর ফলে – a systematic underproduction, undervaluation, and underuse of public health professionals, nurses, and community health workers. The quest to use high-tech, specialist-delivered, and hospital-based medical care, with little regard for primary health care or evidence-based practices has worsened the huge health inequities and increased the costs of health care. (K. Srinath Reddy et al, “Towards achievement of universal health care in India by 2020: a call to action,” Lancet February 26, 2011: 760-768)।

আরো কথা হল, বর্তমান সময়ে বাজার-কেন্দ্রিক মুক্ত অর্থনীতি মানুষকে ক্রমাগত বাধ্য করছে ঊচ্চমূল্যে স্বাস্থ্যপরিষেবা ক্রয়ের দিকে যেতে। জন্ম নিচ্ছে “মেডিক্যাল পভার্টি ট্র্যাপ” এবং “মেডিক্যাল ট্যুরিজম”-এর মতো স্পেস। ইতিহাসের হয়তো বা এক পরিহাসের মতো আলমা-আটা (১৯৭৮) সম্মেলনের পরে কলকাতায় ২০০০ সালে প্রবল উদ্দীপনা নিয়ে National Health Assembly-র একটি মিটিং হয়েছিল ৩০ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এতে ১০০০-এরও বেশি health activist অংশগ্রহণ করেছিলেন স্বাস্থ্যকে বাজার থেকে মুক্ত করার স্বপ্ন নিয়ে। একই বছরে ঢাকার সাভারে ৪-৮ ডিসেম্বর People’s Health Assembly-র প্রথম বা উদ্বোধনী সম্মেলন হয়েছিল। এতে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার তৎকালীন ডিরেক্টর জেনেরাল হাফডান ম্যালার ছাড়া আর কোন গুরুত্বপূর্ণ কর্তাব্যক্তি অংশগ্রহণ করেননি। স্বাস্থ্য মুক্ত হবার বদলে, মানুষের বেঁচে থাকার একটি মৌলিক অধিকার হবার বদলে ক্রমাগত প্রবেশ করেছে মুক্ত বাজারের অর্থনীতির বেষ্টনজালে, স্বাস্থ্য হয়ে উঠেছে স্বাস্থ্য পরিষেবা। ভারতের জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি কি পারবে একটি অধুনা-পরিত্যক্ত প্রায় কল্যানকামী রাষ্ট্রের সদিচ্ছাকে সামাজিক স্তরে মানুষের অধিকার বা entitlement হিসেবে ব্যক্ত করতে? পারবে দানবিক কর্পোরেট সেক্টর নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রের হেলথ কেয়ারের ধারণার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে স্বাস্থ্যের প্রাথমিক বোধকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে?

যেকোন চিন্তাশীল মানুষ বুঝবেন প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা বা primary care অতি দুর্বল জায়গায় এবং নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে বলে সামান্য জটিল পরিস্থিতিতে রোগীরা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে প্রায় ব্যতিক্রমহীনভাবে tertiary centre-এ রেফারড হয় (অবশ্য জোরালো “ক্যাচ” থাকলে পরিস্থিতি অবশ্যই অন্যরকম হয়)। এর ফলে tertiary centre-এ যেমন মুনাফা হয় (প্রাইভেট হাসপাতাল বা নার্সিং হোমের ক্ষেত্রে) তেমনি সরকারি হাসপাতালগুলোতে এক অসম্ভব চাপ তৈরী হয়। যথেষ্ট সংখ্যক ডাক্তার না থাকাও এর একটা বড়ো কারণ হয়ে ওঠে। পরিণতিতে একজন ডাক্তারের পক্ষে – সে জেনারাল ফিজিসিয়ানই হোক বা সুপার-স্পেশালিস্ট হোক – এ পরিস্থিতির মোকাবিলা করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। গড়ে রোগী পিছু দু-এক মিনিট করে সময় দেওয়াও কার্যত অসম্ভব হয়ে ওঠে। এর শিকার হয় ডাক্তার এবং রোগী উভয়েই। রোগীর মনে বাস্তবসঙ্গত কারণেই এমন ধারণা তৈরী হয়ে যে সে উপযুক্ত নজর ও গুরুত্ব পাচ্ছেনা, একটি কেস নম্বর ছাড়া এরকম স্বাস্থ্যব্যবস্থায় সে আর কিছু নয়। ডাক্তারের ভাবমূর্তি তৈরী হয় মানুষ-বিচ্যুত, রোগী সম্পর্কে উদাসীন এবং উদ্ধত (অনেক ক্ষেত্রেই সত্যিও বটে) এক না-মানুষ সত্তা। জীবন-মরণকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক অতি সংবেদনশীল, নিতান্ত আবশ্যক, ঐতিহাসিক সম্পর্কের করুণ পরিণতির আলেখ্য রচনা হতে থাকে।

এখানে আরেকটি গূহ্যতর সত্যকে সংবেদী মানুষকে বুঝতে হবে। সমাজতত্ত্ব, রাজনৈতিক-অর্থনীতি বা পোলিটিক্যাল সায়ান্সের সামান্য পাঠও আমাদের অবহিত করে যে সামাজিক অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক সুরক্ষা বা চাকরির সম্ভাবনাহীনতা যখন প্রাধান্যকারী জায়গায় থাকে তখন একদিকে জনমোহিনী রাজনীতির সামান্য অনুদানও জনসমাজ খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরতে চায়, আবার অন্যদিকে শূণ্যদিশা জনসমাজের প্রবল ক্ষোভ এবং অপূর্ণতা mob violence বা গণহিংসার চেহারা নিয়ে আছড়ে পড়ে। স্মরণ করতে পারি সত্যজিতের “জনঅরণ্য”, মৃণালের একাধিক ছবি, শ্যাম বেনেগাল বা গোবিন্দ নিহালনি-র বিভিন্ন চলচ্চিত্রের কথা। আমরা দেখেছি নিস্ফলা ক্রোধ এবং আক্রোশ কিভাবে জনসমাজে প্রতিবিম্বিত হয়। এখানে ডাক্তারকে স্থাপন করলে দেখবো সে একজন সফল, ঈর্ষণীয়ভাবে স্বচ্ছল এবং ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষ। এর বিপরীতে রোগীটি আর্ত, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপযুক্ত সম্বলহীন এবং ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে দূরে থাকা একজন ব্যক্তি মানুষ। একদিক থেকে দেখলে এ দ্বন্দ্ব ক্ষমতা এবং ক্ষমতাহীনতার মধ্যেকার দ্বন্দ্বও বটে। কিন্তু ক্ষমতাসম্পন্ন হলেও একজন আমলা বা পুলিস বা শিল্পপতি বা রাজনৈতিক নেতার সাথে ডাক্তারের পার্থক্য হল একজন আমলা বা পুলিস বা রাজনৈতিক নেতা সরাসরি ক্ষমতাকেন্দ্রের অংশীদার, এর উপাদান। একজন শিল্পপতি বহুলাংশে এদের নিয়ন্ত্রক। কিন্তু একজন ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মী ক্ষমতাকেন্দ্রের সাথে যুক্ত নয়। এবং এ অর্থে “ক্ষমতাচ্যূত”, ফলে এরা জনরোষের ক্ষেত্রে একটি soft target যাকে সহজেই আক্রমণ করা যায়, নিজেদের প্রবল ক্ষোভকে সহজে উগড়ে দেওয়া যায় এদের ওপরে। একটি সহজ উদাহরণ হল একজন জনপ্রতিনিধি এয়ারলাইন্সের একজন অফিসারকে আক্ষরিক অর্থে পিটিয়েও দিব্যি মেজাজে ঘুরে বেড়াতে পারেন। কোন আইন নেই একে শাস্তি দেবার বা সাধারণ মানুষের সাধ্যি নেই একে ছোঁবার। কোন Parliamentary Act তৈরী হয়না একে স্পর্শ করার জন্য। বিপরীত চিত্রটি কলকাতায় ঘটে। করজোড়ে ক্ষমাপ্রার্থী বৃদ্ধ ডঃ আগরওয়ালকে গণপ্রহারে গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। দক্ষিণ বা পশ্চিম ভারতে গণপ্রহারে নবীন ডাক্তারের মৃত্যুও ঘটে।

আরেকটু তলিয়ে দেখলে চোখে পড়বে, বয়স এবং লিঙ্গ নিরপেক্ষভাবে একজন মানুষ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে এলে চিকিৎসা পাবে এটা সবার কাছে এতোই স্বাভাবিক একটি ঘটনা এবং এতোই স্বাভাবিকভাবে আমাদের আকাঙ্খা ও মর্যাদাবোধের মধ্যে পড়ে যে এর কোন ব্যত্যয় হলে আমরা আহত বোধ করি, উত্তেজিত হয়ে পড়ি। অথচ কলেজ বা স্কুলে ভর্তি হতে গিয়ে অসফল হলে এমন কোন বোধ জন্ম নেয়না। ওটাকে মেধার ঘাটতি বলে মেনে নিই। অর্থাৎ স্বাস্থ্যের অন্তর্লীন বোধের সাথে অন্য বিষয়গুলোর মূলগত পার্থক্য আছে। স্বাস্থ্য আমাদের কাছে একটি মূল্যবোধ বলে মনে হয়, এখনো জনমানসে সেভাবেই প্রতিভাত হয়। চিকিৎসক বা ডাক্তারকে গণ্য করা হয় এই মূল্যবোধের ধারক বা ব্যক্তরূপ হিসেবে। কিন্তু বিশেষ করে বিগত শতকের ৮০-র দশকের মাঝামাঝি থেকে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় ক্ষেত্রে value বা মূল্যবোধ সূক্ষ্মভাবে রূপান্তরিত হতে শুরু করলো বাজারের মূল্যমানে, যাকে বিভিন্ন স্তরের মূল্য দিয়ে ক্রয় করা যায়। কিন্তু চিকিৎসা-প্রত্যাশী মানুষ এবং economic man তথা consumer বা ভোক্তার মধ্যেকার প্রভেদ চোখে পড়বে শ্রীনাথ রেড্ডির তুলে ধরা এ কাহিনীটি জানলে। রেড্ডি জানাচ্ছেন রাজেশ বলে একজন ব্যক্তি যথেষ্ট কম মজুরিতে দিল্লীর একটি জামা-কাপড়ের দোকানে চাকরি করতো। তার হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক বা myocardial infarction হয়। তাকে দ্রুত একটি প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়ে গেলে জানানো হয় চিকিৎসার খরচ পড়বে প্রায় ৫০,০০,০০ টাকা। টাকা দিতে অপারগ রোগীর পরিবার রোগীকে শেষ অব্দি AIIMS-এ নিয়ে গেলে রোগীর সেরে ওঠা পর্যন্ত চিকিৎসার খরচ হয় ৬,৫০০ টাকারও কম। রেড্ডি একটি ছোট্ট মন্তব্য করছেন এই অভাবী রোগীর পরিপ্রেক্ষিতে, “to comfort him is constrained by a system that does not provide for universal health coverage.” (K. Srinath Reddy, “India’s Aspirations for Universal Health Coverage”, New England Journal of Medicine 373.1 (2015): 1-5) এ লেখাতেই রেড্ডি জানালেন ভারতে বেসরকারী চিকিৎসার বিপুল খরচ (কোন কোন ক্ষেত্রে মাসিক আয়ের ২৫-৪০%) মেটাতে গিয়ে প্রায় ৬.৫ কোটি মানুষ ভারতবাসী প্রতিবছর দারিদ্র্যসীমার নীচে চলে যায়। একে বলা হয় “মেডিক্যাল পভার্টি ট্র্যাপ”।

 আমাদের কাছে স্পষ্টতই দুটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে আসে – (১) অর্থমূল্যে্র দিক থেকে সরকারী পরিষেবা আর মুনাফা-উৎপাদক বেসরকারী হাসপাতালের মধ্যেকার ফারাক; (২) universal health coverage বা সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা না থাকা অভাবী এবং অসহায় মানুষের ক্ষেত্রে কি ভয়াবহ পরিণাম তৈরী করতে পারে। এই রূপান্তরের এক সুদীর্ঘ কাহিনী রয়েছে যা এখানে আলোচনা করা সম্ভব নয়, বর্তমান পরিসরে খুব প্রয়োজনীয়ও নয়।

“পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন”। এ লেখা এ অসুখকে বোঝার একটি ছোট্ট পরিক্রমণ মাত্র

 

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here