তুলির টানে এঁকে ফেলা জীবন্ত চিত্র শিল্প হারিয়ে যাচ্ছে অবহেলায়

0
118

 

পূর্ব বর্ধমানঃ রঙ-তুলি নিয়ে সময় কাটাতে ভালোবাসেন না এমন লোক হয়তো কমই আছেন। কেউ কোন নেশায় বসে, কেউবা বা আবার পেশায়। বাস্তবটাকে নিখুঁত করে তুলির টানে ফুটিয়ে তুলতে পারেন কেবল মাত্র একজন চিত্র-শিল্পী। এমনই এক ছবির কারিগরের খোঁজ মিললো পূর্ব বর্ধমান জেলার মেমরিতে। আঁকা-আঁকি নিয়ে কিছুটা সময় আড্ডা হয় তার সাথে, জানা হয় ছবি আঁকার কিছু গল্প। চুপ করে মন দিয়ে শোনেন ও একের পর এক ছবি আঁকা দেখেন এক জন সাংবাদিক। শোনেন তার শিল্পী জীবনের কিছু কথা। অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে এক প্রতিভাবান শিল্পী।

 

বছর চারেক হল তিনি ঘর ছাড়া। এদিক ওদিক বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে এখন তার ঠাঁই হয়েছে মেমারি স্টেশনের ২ নং প্লাটফর্মে। যার নাম শিবহরি দে। বাড়ি তার মেমরির পুরোনো পোস্ট অফিস পাড়ায়। কিন্তু বছর তিনেক হলো তিনি মেমারি স্টেশনে জীবন কাটাচ্ছেন। গায়ে ছেড়া জামা মাথায় ফেট্টি বেঁধে মেমারির ২ নং প্লাটফর্মে সারাক্ষণ বসে থাকে আপন মনে। নিত্যযাত্রী হোক বা সাধারণ মানুষ যদি কেউ তার সামনে এক বার বসে তো পেন্সিলের মাধ্যমে তার ছবি ফুটিয়ে তোলেন আর্ট পেপারে ওই শিল্পী। আর তার পারিশ্রমিক নেন মাত্র ৫০ টাকা। এই শিল্পী  অনেক জীবনে অনেক বড় হতে চেয়েছিল ও শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে চেয়েছিল কিন্তু ভাগ্যের চক্রে কোনটাই হয়নি।

 

স্থানীয় শিল্পী বিজয় চন্দ্রের কাছেই আঁকা শিখেছিলেন এই শিল্পী। তার প্রতিভা দেখে তিনি জানান জেলায় এমন প্রতিভাবান শিল্পী খুঁজে পাওয়া এখনকার দিনে খুব দুষ্কর, আপাতত এই শিল্পী তাঁর শিবহরির পাশে রয়েছেন। পাশে রয়েছেন তার এক বন্ধু তন্ময়। কিন্তু তাতে আর কতটুকু আশা মিটবে। আপাতত দরকার তার ভালো চিকিৎসা, দরকার একটা আশ্রয়, দরকার আর্টিস্টের কোন কাজ। তাহলে হয়তো এই তরুণ প্রতিভা কে বাঁচানো সম্ভব হবে।

শিবহরি বলেন, “ ছবি আঁকার শুরুটা সেই ছোটবেলা থেকেই, চক দিয়ে সারা বাড়ির কালো মেঝে সাদা করে দিতাম ছবি এঁকে। তারপর একটু বুঝতে শেখার পর বিভিন্ন আর্টস্কুলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছোট বেলা থেকেই। এখন তো ছবি আঁকা রক্তেই মিশে আছে। তার কাছে জানতে চাইলে, কী ধরনের ছবি আঁকতে ভালোবাসেন তিনি? উত্তরে জবাব দেন, “ছবি আঁকার ক্ষেত্রে আমার প্রিয় বিষয় হলো মানুষ। মানুষ আঁকায় খুব মজার ব্যাপার হলো মানুষের ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন ও বডি ল্যাংগুয়েজ খুব সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা। যখন কোনও মানুষের প্রতিকৃতি আমার ক্যানভাসে ফুটে ওঠে, সে মানুষটাকে কেন যেন খুব আপন মনে হয়।

স্টেশনে অনেককেই বলতে শোনা যায়, ছবি আঁকা নাকি শুধু মাত্র নেশাতে মানায়, কোন পেশাতে নয়। ছবি আঁকাটা ওর একটা নিজের পেশা, তাই ছবি আঁকা যে পেশা হতে পারেনা সেটার সাথে কোনও মতেই একমত দেব না। একজন শিল্পী যদি শুধু নিজের জন্যেই ছবি আঁকে তাহলে শিল্পের বিস্তার কবে ঘটবে বা কিভাবে ঘটবে? কবে সে বাইরের মানুষের কাছে প্রকাশ পাবে?  এত সুন্দর সুন্দর রুচিশীল পোশাক, কাপড়, আর ফ্যাশন এসব আমাদের সকলের দারপ্রান্তে পৌঁছবে কীভাবে? তাই আমি মনে করি আমাদের জীবনে আজকের দিনে একজন পেশাদার শিল্পীর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিল্পী অনেক ছবিই আঁকেন, তবে বিশেষ প্রিয় কোনও ছবি থাকে যার পেছনের গল্পটাও হয়তো একটু অন্যরকমও হয়।

 

আমাদের দেশে প্রতি বছর অনেক নারী ও পুরুষ চিত্রশিল্পী, আর্টিস্ট ছবি আঁকার জগতে প্রবেশ করে, তেমনই একই ধারায় হয়ত আবার তাদের ঝরে পড়তে হচ্ছে। কেউ পারিবারিক বা সাংসারিক নানা চাপে তারা তাদের কাজের ধারা থেকে সরে আসতে বাধ্য হচ্ছে। একজন শিল্পীর মনের চিন্তা, চেতনাই ফুটে ওঠে তার আঁকা ক্যানভাসের মধ্য দিয়ে। একজন শিল্পীর শিল্পচর্চার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ, পারিবারিক সহযোগিতা ও মানসিক শান্তি। যেটি আমাদের সামাজিক ব্যবস্থায় একজন নারী ও পুরুষের জন্য পাওয়া বেশ ভাগ্যের ব্যাপার। তবু এই পরিবেশে যুদ্ধ করে, নিজের পথে অটল থেকে নিজেদের ক্ষেত্রে এগিয়ে গেছেন অনেক শিল্পী।